প্রতি ১৫ মিনিটে

দেবজিৎ সাহা on

তখন ক্লাস ইলেভেনে পড়ি।  একদিন ক্লাসে আমাদের বাংলা স্যার একটা খবরের কাগজ নিয়ে প্রবেশ করলেন। আমাদের যিনি বাংলা পড়াতেন তিনি একটু অন্য ধরনের মানুষ ছিলেন। ঠিক কেমনটা বলা কঠিন। তবে এটুকু বলা যায় অন্যান্য অনেকের সাথে তাকে পার্থক্য করা যেত। সমাজ, অর্থনীতি  এবং সংস্কৃতি এবং সকল বিষয়ে তার একটা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। স্যারের কিন্তু ঠোঁট কাটা ছিল। প্রচণ্ড  হাস্যরসিক ছিলেন।

তা যাইহোক । প্রসঙ্গে আসি। সেদিন আমরা বেঞ্চ থেকে স্যারের হাতের নিউজ পেপারের প্রথম পাতার হেডলাইন টা দেখতে পাই।

“ধনঞ্জয়- এর ফাঁসি ” সম্বন্ধীয় কোন হেডলাইন। স্যার চেয়ারে বসতেন না। উনি টেবিলে বসা পছন্দ করতেন।কারণ আমাদের ঘরটা ছিল অনেক বড়ো।আর প্রচুর স্টুডেন্ট। তাদেরকে তদারকি করতে বোধহয় ওখান থেকে সুবিধে হত। সেদিন আমাদেরই এক বিচ্ছু বন্ধু শেষ বেঞ্চ থেকে স্যারকে একটা প্রশ্ন করে , ” স্যার রেপ কাকে বলে ” । সে লুকিয়ে প্রশ্নটা করে। স্যার কে বিব্রত করার জন্যই তার এই প্রশ্ন ছিল। সেটা আমরা জানতাম। তারপর স্যার যে উত্তর দিয়েছিলেন তাকে উদ্যেশ্য করে তা আমি আজও ভুলিনি। হয়তো কেউ ভোলেনি যারা শুনেছিল। আর আমার ওই বন্ধুটার মানসিক পরিস্থিতি কি ছিল সে সময় সেটা আমরা বুঝতে পেরেছিলাম। সে হয়তো কোনদিন এরকম একটা নককার জনক বিষয়ে এতটা ক্যাসুয়াল  হওয়ার চেষ্টা করেনি।

তার পরেরদিন সম্ভবত ধনঞ্জয়ের ফাঁসি ছিল। হেতাল পারেক নামে একজনকে ধর্ষণ ও হত্যা করার অপরাধে। সেটাই   ধর্ষণ ও হত্যা এবং তার শাস্তি সম্পর্কে প্রথম জ্ঞান। জেনেছিলাম প্রাই ১৪ বছর ধরে কেস চলেছিল। শেষে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন যায়।কিন্তু তিনি খারিজ করেন। ফাঁসি হয় । পারেকের পরিবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আনন্দে মেতে ওঠে সমাজ। তারপর আস্তে আস্তে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে ওঠে ৷ তখন স্কুলে পাড়ি | এসব বিষয়ে এত টা ভাবেতও শিখিনি | সে দিন থেকে আজকে দিনের হিসেব করলে দেখতে পাই পেরিয়ে গেছে অনেকটা সময়  | সেই একই অন্যায় ঘটে গেছে বহুবার। বিচার ব্যবস্থার রঙ বদলেছে। বদলাইনি অপরাধের ধরন ও প্রবণতা। দিনের পর দিন আরো নৃশংসতার রূপ নিয়েছে। আজকে সেই বহু পুরনো অপরাধ দৈনন্দিন খবরে স্বাভাবিকতার রূপ নিয়েছে।

আজকের বলার ভাষা নেই। তবুও বলতে হবে। নিথর হয়ে পরে থাকলে চলবেনা। আর কত ?

ঠিক যে সময়ে আমি লিখছি , তখনও ঘটে চলেছে সেই একই অপরাধ। রেপ । আজকে গুজরাটে ঘটে গেছে ওই একই ঘটনা। ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়েছে। ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে দেহ। ঠিক আজকের দিনে। আমার জেলাতেই ঠিক পাঁচ দিন আগেই ঘটে গেছে মর্মান্তিক ঘটনা। একটা ছোট্ট মফঃস্বল শহরের বুকে দাড়িয়ে সাক্ষী হতে হচ্ছে প্রায়শই ঘটে যাওয়া একই ঘটনার পুনরাবত্তি। শহর, গ্রাম অপরাধের একই ছন্দে এগিয়ে চলেছে।

তাহলে ভুলটা কোথায় হচ্ছে ? স্বাধীনতাত্তোর  ভারতবর্ষ যখন সবে পথ চলা শুরু করেছে ঠিক সেই সময়ের  সাথে আজকের ভারতবর্ষের বিস্তর ফারাক যদি তা বাহ্যিক জাঁকজমকের দিক দিয়ে দেখা যায়। উন্নত হয়েছে অনেকাংশেই। সেটা সময়ের নিয়মেই। কিন্তু অপরাধ দমনে আমরা কিছুই করতে পারিনি। অফিসিয়াল ভাবে ভারতবর্ষের প্রথম রেপ ঘটনার সাক্ষী হয় মথুরা যেখানে বারো বছরের এক আদিবাসী মেয়ের ধর্ষণ হয়। সালটা ১৯৭২।তাকে ধর্ষণ করা হয় একটা পুলিশ স্টেশন – এ । ঠিক তার এক বছর পর বোম্বের এক হসপিটালের নার্স অরুণা সনবাগ – কে ধর্ষনের পর মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়। নির্যাতিতা প্রায় ৩০ বছর ধরে ব্রেইন ডেথ অবস্থায় পড়ে থাকে কোনো এক হসপিটালে। অপরাধী সহানলাল ভারতা বাল্মীকি ধরা পরে। শাস্তি হয় মাত্র দু দফায় সাত বছরের। আক্ষেপের বিষয় কি জানেন ? তাকে ধর্ষক হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়নি। ডাকাতি এবং হত্যার প্রচেষ্টার জন্য তাকে শাস্তি দেওয়া হয়। ১৮ মেই, ২০১৫ তে অরুণা মৃত্যুবরণ করে।

প্রতি পনেরো মিনিটে একটা করে রেপ ঘটে চলেছে। আশ্চর্যের বিষয় প্রতি চারটে কেসের মধ্যে মাত্র একটা কেসে ধর্ষণকারীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

সরকারি হিসেব দখলেই চমকে উঠতে হয়। আর তার বাইরে রয়েছে প্রচুর ঘটনা যেগুলো হয়ত কোনদিন ঘটনার সংজ্ঞা পায়নি।

থাংযাম মনোরামার ক্ষতবিক্ষত গুলিবিদ্ধ দেহ তার বাড়ির তিন কিলোমটার দূরে পাওয়া যায়। ঘটনাটা ২০০৪ সালের। অভিযুক্ত হয় অ্যাসাম রাইফেলের কয়েক জন। ইনভেস্টিগেশন শুরু হয়। কোন কনভিকশন হয়নি । প্রশাসনের চরম ব্যর্থতা ছাড়া এটাকে কি বলা যায়? ২০১৪ সালে ১০ লাখ টাকা নির্যাতিতার পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আদেশে। কালপ্রিটরা আজও সাজা পায়নি।

২০০৯ , কাশ্মীরের দুজনকে ধর্ষণ এবং হত্যা করা হয়। ৪৭ দিনের প্রতিবাদের পরও কিছু হয়নি ।

সোনম সোরির নিথর দেহ পাওয়া যায়ভউত্তরপ্রদেশ – এর লাখিম্পুর খেরি পুলিশ স্টেশন চত্বরে। ঘটনাটি ঘটে ২০১১ সালে । ভার্ডিকট আজও নেই।

তারপর থেকে একে একে নির্ভয়া, কথুয়া, উন্নাও আরো অনেক ঘটনাই ঘটে গেলো। ঘটে চলেছে। ভারতীয় সমাজ কে কতদিন এই লজ্জা বহন করতে হবে জানা নেই।

কেনোই বা আজকে এই বেদনা, এই কষ্ট সাধারণ মানুষ বহন করে চলেছে। সে উত্তর কে দেবে। দশকে দশকে আইন আরো কঠোরতর হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন , এনকাউন্টার। আশ্চর্য নির্মমতার পুনরাবৃত্তির হার বেরেই চলেছে। অপরাধীরা কেন ভয় করছে না মৃত্যুকে? হায়দ্রাবাদ এনকাউন্টার হওয়ার পর চার চারটে একই ঘটনা বিভিন্ন জায়গায় ঘটে গেলো। এই প্রশ্ন তো বার বার জাগে মনের মধ্যে। অপরাধী কে ধরা। তারপর তাকে শাস্তি দেওয়া। এর বাইরেও থেকে যাচ্ছে অনেক প্রশ্ন।

ভারতীয় সমাজে নারীর অবস্থানের দিকে যদি লক্ষ্য করি তাহলে নারীদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বললে ভুল হবেনা। নারী পুরুষের সমান অধিকার – এই বিশ্বাস পিতৃতান্ত্রিক আমাদের সমাজের মাটিতে আজও ভালোভাবে শিকড় ছড়াতে পারেনি। আমাদের মনের কোন এক জায়গাই তাদেরকে এখনও সমান অধিকার আমরা দিতে পারিনি। নারী সমাজের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি খুব একটা পরিবর্তন বোধ হয় হয়নি। শুরু থেকে এ লড়াই আজও চলছে যেখানে বারবার হেরে যেতে হয়েছে তাদের। পুরুষের থেকেই তাদের হয়েছে  সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি।

তাদের ওপর বারবার ঘটে যাওয়া নৃশংস ঘটনার জন্য তাদেরকেই আমরা উপদেশ দিয়েছি। তাদেরকেই সাবধান করেছি। তাদের স্বাধীন চিন্তাধারাকে বার বার কাঠগড়ায় নিয়ে এসেছি। দোষ দিয়েছি তাদের পোশাকের , তাদের চলাফেরার। যে গুলো সবই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। নির্যাতিতা আমাদের কাছে হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ। নারীদের ওপর আমরা যে সামাজিক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছি তার দরুনই হয়ত তারা সুরক্ষার দিক দিয়ে অবহেলিত। দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন এর জন্য আমাদের যা যা করণীয় সেটার ওপর বোধহয় গুরুত্ব দিলে সুরক্ষার কাজটা আরো সহজ হত। কোন না কোনভাবে আমরা একটা দায়িত্ব আড়াল করছি। সেখানে কোন স্বার্থ থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা বোকামি ছাড়া কিছুই না। পুরুষ সমাজের অবচেতন মনের উদ্যেশ্য নিয়ে এখানে একটা বড়ো প্রশ্ন রয়ে যায়।

এইসবের সাথে জড়িয়ে আছে ধর্মীয়, আর্থসামজিক এবং জাতিগত কারণ। ধর্মীয় ভাবে প্রভাবিত সমাজ তার দৃষ্টিভঙ্গিকে অনেকাংশেই ধর্মীয় ভাবে বিচার করে। আর সেখানেই হয় গন্ডগোল। আর্থসামাজিক ও জাতিগত ভাবে বিচার করলে সমাজের অন্যান্য স্তরের নারীদের ওপর অত্যাচারের কিছু কারণ খুঁজে পাওয়া যায়। অর্থনৈতিক এবং জাতিগত ভাবে পিছিয়ে পরা গোষ্ঠী বিপদের খুব কাছেই বিচরণ করে। তাদেরকে শিকার করা অপরাধীদের সহজ হয়। তাদের ওপর ঘটে যাওয়া অপরাধের বোঝা ন্যায়ের দরজা পৌঁছতে পারেনা। সেই জোর এবং সম্বল তাদের নেই। তারা বড়ো অসহায়।

তারপর বিচার ব্যবস্থার যে দীর্ঘ সফর সেটা শেষ করতে করতে আমাদের মন থেকে কখন যেনো ঘটনাগুলো মুছে যায়। জমতে থাকে পরবর্তীতে ঘটে যাওয়া আরো ঘটনা।

একের পর এক ঘটনা ঘটবে। আর আমরা ক্ষোভ প্রকাশ করব। তারপর চাইবো শাস্তি। দেওয়া হবে মৃত্যুদণ্ড। তারপর কিছুদিন বিশ্রাম। তারপর আবার। তারপর আবার শাস্তি । মৃত্যুদণ্ড, যাবতজীবন। দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে একটু ভাবলে কিম্বা প্রশ্ন করলে হয়না ? অতীতের তুলনায় আজকে শিক্ষার বিস্তার তো অনেক বেশি। সরকার প্রতিটা বাচ্চা যাতে শিক্ষার আঙিনায় পৌঁছায় তার জন্য তো প্রচুর পরিকল্পনা নিয়েছে। তাতে অনেকটাই সফল। কিন্তু কোথাও যেন একটা কিছুর অভাব অনুভব করা যায়।

ফিরে আসি আমার ক্লাস ইলেভেনের পুরনো গল্পে। আমাদের স্কুলটা চিরাচরিত ভাবেই বয়েজ স্কুল ছিল । ছোটবেলা থেকেই একটা ছেলের মেয়েদের জগৎ – এর প্রতি প্রচণ্ড কৌতূহল থাকে।  সেই কৌতূহলের দিক অনেক। কোন না কোন ভাবে সেই কৌতুহল থেকেই জন্ম নেয় তাদের পৃথিবীতে প্রবেশ করার অদম্য ইচ্ছে। আর সেই ইচ্ছেটা কতটা মারাত্মক আকার ধারণ করে তা বলাবাহুল্য। এর মধ্যেই যে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতে অপরাধ করার বীজ তা কিন্তু ফেলে দেওয়া যায় না। মনে পরে কখনোই কোন ক্লাসে আমাদের যৌনতা নিয়ে কোন শিক্ষাই দেওয়া হয়নি । মেয়েদের  প্রতি যেকোন বিদ্রুপ মনোভাব থেকেই শুরু হয় তাদের প্রতি অপরাধ। তাদেরকে নিয়ে চলতে থাকে অন্য একটা জগৎ রচনা যা আমাদের রিপ্রেসড ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। আমাদের কোনদিনই কেউ বোঝতে আসেনি যে এইসব থেকেই ভয়াবহতার জন্ম নিতে পারে। ভবিষ্যত বিপন্ন হতে পারে । আজকে নারী পুরুষ ছাড়া এই সমাজ কখনোই পরিপূর্ণ না। বৈষম্যটাকে যদি শিক্ষার সেই সন্ধিক্ষণ থেকেই নির্মূল করার চেষ্টা হত তাহলে বোধহয় ভালোই হত।

এত গেলো সামাজিক একটা আলোচনা। প্রশাসনিক পরিকাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আরো কথা বলতে হয়। স্কুল কলেজের বাইরেও আলাদা একটা জগৎ রয়েছে। যদিও প্রশাসনের কাজের মধ্যে সবকিছুই পরে তবুও সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনের আলাদা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আমাদের প্রশাসনের নাগাল যথেষ্ট সীমাবদ্ধ। তার মধ্যে নারীদের সুরক্ষা দেওয়া ছাড়া তাদের অন্যদেরকেও সুরক্ষা প্রদান করতে হয়। সেখানে সমানভাবে সবদিক নজর রাখা কঠিন হয়ে পরে। আর সব থেকে বেশি সুরক্ষা দিতে হয় নেতা মন্ত্রীদের। দিল্লীর মত একটা জায়গার উদাহরণ দিলেই সেটা বোঝা যায়। ২০১২ সালের একটা সমীক্ষা অনুযায়ী দিল্লী পুলিশের কর্মরত অফিসারের সংখ্যা প্রায় ৮৪০০। কিন্তু তার তিন ভাগের এক ভাগ বরাদ্দ নাগরিক সুরক্ষার জন্য। বাদবাকি নেতা মন্ত্রী এবং অন্যান্য VIP লোকজনদের সুরক্ষা দিতে ব্যবহার করা হয়। সমীক্ষা অনুযায়ী ২০০ নাগরিকের জন্য যেখানে একজন অফিসার বরাদ্দ সেখানে একজন নেতার পেছনেই বরাদ্দ ২০ জন। দিল্লী পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো পুলিশ সংস্থার মধ্যে একটি। এবার পুরো দেশের অন্যান্য রাজ্যের অবস্থা কি হতে পারে সেটা কমবেশি বোঝা যায়। ধর্ষণ মোকাবিলায় ভারতবর্ষের অন্য কোন প্রশাসনিক সংস্থা নেই যেখানে শুধু সামাজিক এবং প্রশাসনিক ত্রুটি গুলো নিয়ে পরীক্ষা করা যেতে পারে। বর্তমান আইন ব্যাবস্থা দেখলে মনে হয় সেখানে চিনির রসের মধ্যে ডুবে থাকা পিপড়ের মত কেস পরে রয়েছে । ২০১৬ পর্যন্ত ১৩৩০০০ কেস এখনও বিচারের আশাই। জনরোষকে ঠেকাতে মৃত্যুদণ্ড কিম্বা অন্যকোনো কঠোর শাস্তি এর সুরহা  নিয়ে আসতে ব্যর্থ। প্রফেসর জেফ্রি ফ্রেগানের মতে “we are very hard pressed to find really strong evidence of deterrence ( from capital punishment).”  ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট যদি সমাধান আনতে পারতো তাহলে প্রতিদিন আমরা নতুন ঘটনার সাক্ষী হতাম না। যদিও ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট থাকা না থাকা অপরাধ কে পুরোপুরি নিশ্চিত করছে না। অপরাধ করার সময় অপরাধী দুটো দিকে খেয়াল রাখে। এক পানিশমেন্ট। আর একটি ধরা না পরা। যদি সে ধরাই না পরে তাহলে পানিশমেন্ট- এর কোন প্রশ্নই আসছে না। আমাদের দেশে এরকম প্রচুর ঘটনা আছে যার কনভিকশন এখনো হয়নি । প্রফেসর দানিয়েল নেগাল বলেছেন,  ” It’s the certainty of apprehension that’s been demonstrated consistently to be an effective deterrent, not the severity of the ensuing consequences.”  বারংবার ঘটে যাওয়া অপরাধ এবং শাস্তি ঘোষণার মাঝে রয়েছে বিশাল অনিশ্চয়তা। সেই যায়গা গুলোর উত্তর আমাদের পেতে হবে। সমাজে অপরাধ এবং শাস্তির সম্পর্ক তো থাকবেই। সেটা থাকুক। কিন্তু আজকে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার সময় সত্যিই এসেছে।

এবার আসি বর্তমান রাজনৈতিক ভাবে সচেতন সমাজের কাছে। যেখানে আমি , আপনি সবাই আছি।

রাজনীতি আজকে আমাদের মজ্জায় মজ্জায় ঢুকে গেছে।

তর্ক বিতর্ক জড়িয়ে পড়লে আমাদের খিদে পায়না। খিদে পায়না ভালো বিচার ব্যবস্থার। খিদে পায়না ভালো প্রশাসনের । খিদে পায়না একটা টাটকা  অর্থনীতির । সমাজব্যবস্থার এই অবক্ষই কেনই বা হচ্ছে। কেনই বা আইন কানুন এত থাকতে একই অপরাধ বার বার ঘটে চলেছে। কারণ সেই সকল পশু গুলো জানে যে এটাই সঠিক সময় । এখনই সেরে ফেলা যায় সেই কাজটা। তারা বুঝতে পারছে মানুষ আজকে নিজেরা বিভক্ত হয়ে পড়েছে।লড়ছে নিজেদের মধ্যে। ব্যস্ত অন্য বড়ো কিছু নিয়ে ভাবতে যেখান থেকে বেরিয়ে আসা কখনোই যাবে না। মানুষ আজকে অন্যমনস্ক। আজকে তার মন স্থির নেই। কখনো এর হয়ে, কখনো ওর হয়ে হয়ে। কখনো এই ঘটনায় কখনো ওই ঘটনাই। ব্যস্ত, শুধু ব্যস্ত হয়ে যাওয়া। এটা রাজনৈতিক নেতারা সেই শুরু থেকেই জানে। জানে আমাদেরকে বারবার বোকা বানালেও আমরা সেই ছলনা কখনই ধরতে পারবো না। দশকের পর হওয়ে আসছে একই খেলা।

ওরা জানে আমরা কখনই তাদেরকে সমাজ ব্যাবস্থার মৌলিক কিছু জায়গা নিয়ে কখনোই প্রশ্ন করব না। কারণ আমরা নিজেদেরকেই কোন প্রশ্ন করব না। প্রশ্ন করব না কেনই বা পাশাপাশি ঘটে যাওয়া চারটে একই পাশবিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া একই ভাবে আসছে না কেন? কেনই বা একদল মতবাদের লোক আরেক দলকে পারস্পরিক গাল মন্দ করছে। কেনই বা দুদিন পর আরেকটা ঘটনা ঘটে গেলে তার কারণ অনুসন্ধান ছেড়ে দিয়ে, নিজেকে প্রশ্ন করা ছেড়ে দিয়ে একই বিরোধিতাই চলতে থাকবে। কেন এটার কোনো শেষ নেই। কারণ আমরা আজীবন আমাদেরকে খুব দূরদর্শী এবং বুদ্ধিমান ভেবে এসেছি।আমরা জানি কিভাবে প্রতিনিয়ত তর্ক করতে হয় বস্তা পচা বিষয় নিয়ে যে বিষয় – এর সমাধান আজও আমরা পাইনি। তাহলে কি আমরা কনফিউজড । তাহলে কি সরকারও কনফিউজড। না, দুটো পক্ষ একসাথে কনফিউজড হতে পারে না। কেউতো চালাক। আমরা যদি চালাক হতাম তবে সব দুর্ঘটনা গুলো আমাদের সাথে ঘটছে কোনো। কেন সাধারণ মানুষ সব হারাচ্ছে। হারাচ্ছে তাদের স্বপ্ন, তাদের ভরসা, তাদের আনন্দ, তাদের সন্তান। ভাবতে হবে খুব গভীর ভাবে ভাবতে হবে।

দুটো গরীব ঘরের মেয়ে এবং একটা পাগলী যখন রেপ হয় গোটা ভারত কেনো একই সুরে কথা বলে না। কেন চায়না কথা বলতে সমান ভাবে। সংখ্যাটা কমে যায় কেন। আজকে একজন অর্থনৈতিক ভাবে সচ্ছল ঘরের মেট্রো শহরের শিক্ষিত মেয়ে , আর কোনো এক রাজ্যের প্রত্যন্ত গ্রামের গরিব , অসহায় পরিবারের মেয়ের সাথে ঘটে যাওয়া একই ক্রাইম কেন সমানভাবে বিচার পাচ্ছে না।

সেই তুলনার হয়তো বড়ো কারণ যোগাযোগ ব্যাবস্থা। গোটা দেশের মানুষ রিলেট করতে পারছে না। কেন গ্রাম এবং শহরের ঘটনার এত মিল। দোষীরা কেন একই পদ্ধতি অবলম্বন করছে। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে  অপরাধীরা আলাদা আলাদা জায়গার হওয়া সত্ত্বেও তাদের পরিকল্পনার মধ্যে পুরোটাই মিল। তাদের মনস্তত্ত্বে একই চিন্তাধারা প্রকাশ পাচ্ছে। দুদিন আগে একই অপরাধের জন্য দোষীদের এনকাউন্টার করা হলো । তারা তো জানে। গোটা দেশ, বিশ্ব জানে। তারা কিন্তু আবার এটাও জানে ঠিক এরকমই বর্বরতার জন্য কাওকে অন্য শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। তারা জানে অনেকেই শাস্তি পাইনি। তারা জানে গরিব ঘরের কোনো মেয়েকে শেষ করে দিলে , তার পরিবার কিছু করতে পারবে না। তারা জানে তারা লুকিয়ে থাকতে পারবে। প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া একই ঘটনায় সবাই কি ধরা পরে। আবার কিছু ঘটনায় ধরা পড়ে যায়। তারা তখন পরে যাই এক দোদুল্যমান পরিস্থিতিতে। যেখানে চলতে থাকে রাজনীতি। তাদের মেরে ফেললে ভালো সুনাম হয় সরকারের। আমরা খুশি হই। এ বড়ো জটিল। অন্ধকার , ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাস্তা নেই। কিন্তু বারবার লজ্জাই মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়ার উদাহরণ। দিশাহীন তর্ক বিতর্ক। আমাদের হয়তো আরো ভাবতে হবে। আরো অনেক প্রশ্ন তৈরি করতে হবে। আরো অনেক উত্তর খুঁজতে হবে। সবকিছু ভুলে গিয়ে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে যাতে কেউ কোনো সুযোগ না পায় আঘাত করার। একে অপরের পাশে সব ভুলে দাড়ালে হয়তো কোনদিন আমরা রাস্তা খুঁজে পাবো। সবচেয়ে বড়ো কথা একে অপরকে রক্ষা করতে পারবো।



দেবজিৎ সাহা

জন্ম ও বেড়ে ওঠা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট শহরে। পড়তে ও লিখতে ভালোবাসেন। ইংরেজী সাহিত্য নিয়ে নর্থ বেঙ্গল ইউনিভারসিটি থেকে স্নাতক ও গৌড়বঙ্গ ইউনিভারসিটি থেকে স্নাওকত্তর । সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই লেখা লেখির জগতে প্রবেশ। কলেজ জীবন থেকেই লেখা লেখি শুরু করেন। পেশায় শিক্ষক। এছাড়াও ফটোগ্রাফি তে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।