একজন টিকটিকি ( পর্ব – ১)

শুভ্রদীপ চৌধুরী on

টিকটিকির বিষয়টা আর গোপন থাকল না।

টিফিন শুরুর ঘন্টা বাজিয়ে সবে একটু বসেছেন দীনবন্ধু মন্ডল এমন সময় জিওগ্রাফির সুদাম স্যার ছুটে এলেন,”আপনাকে হেডস্যার ডাকছেন।তাড়াতাড়ি যান।”

দীনবন্ধু আজ প্রেয়ারের পরেই টের পেয়েছেন, স্কুলে কিছু একটা হয়েছে। তাকে নিয়েই যে ঘটনা তা খানিকটা আন্দাজ করেছেন।আন্দাজ করার কারণ,
এক,আজ সবার মুখ বেশ হাসিহাসি।
দুই,অন্যদিনের মত হইচই নেই চাপা গলায় কথাবার্তা চলছে আর তাকে দেখলেই থেমে যাচ্ছে।
তিন, সবচেয়ে বড় কারণটি হল,ভ্রু কুঁচকে অবাক চোখে মাঝেমধ্যে তার দিকে তাকিয়ে থাকছেন স্যার আর ম্যাডামরা।

এই হরিমতি উচ্চ বিদ্যালয়ের হেডস্যার সাধন বাবু লোক ভাল।সবসময় হাসি মুখে থাকেন।যে কেউ এক ঝলক দেখলেই বুঝবে রোগা টিংটিঙে লম্বা মানুষটা একেবারে অন্যরকম।

দীনবন্ধু হেডস্যারের ঘরের সামনে এসে অবাক হলেন। একটু ঘাবড়ে গেলেন। ঘাবড়াবার কারণ সাধনবাবু গম্ভীর মুখে বসে আছেন।দীনবন্ধুর মনেহল,এই মানুষটিকে আগে কখনও দেখেননি।

” ভেতরে আসতে পারি স্যার?”
সাধন বাবু ভাবলেশহীন মুখে একঝলক দরজার দিকে তাকিয়ে বললেন,”আসুন।”

দীনবন্ধু তার ঘরে ঢুকতেই সাধন বাবু থমথমে মুখে বললেন,”বসুন।”
দীনবন্ধু বসলেন না।
অন্যসময় হলে সাধনবাবু বহুবার বলা কথা গুলো আবার বলতেন,”মনে রাখবেন আপনি এই স্কুলের একজন জ্যান্ত ঘড়ি।বলা চলে স্কুলের নিয়ন্ত্রক।আপনি ঘন্টা বাজালে তবে ক্লাস শুরু হয়,শেষ হয়, ছুটি হয়!সবাই ছুটি দিতে পারে না।অল্প দু একজন মানুষ সেই সুযোগ পায়। আপনি তাদের মধ্যে একজন।”
আজ সেসব কথা উচ্চারণ করলেন না।আগের মত থমথমে গলায় বললেন,”যা শুনছি সব সত্যি?”

দীনবন্ধু নিশ্চুপ। দূরে কোথাও নাম না জানা পাখিটা ডাকছে। এমন আকুল করা ডাক শুনলেই ছোটবেলায় দেখা ‘বড় ভীমরাজ’ পাখির কথা মনে পড়ে। ছোটকাকা চিনিয়ে ছিল,”ঐ দ্যাখ ভি আকারের লম্বা লেজ নিয়ে গাছের মগডালে বসে আছে বড় ভীমরাজ।ও কিন্তু নিজের ডাক নয় অন্য পাখির ডাক নকল করে।কখনও বনের বাইরে যায় না।নীলাভ কালো চকচকে পাখিটির লেজের দু’পাশটি চিকন।দূর থেকে মনে হয় আস্ত একটা রকেট।একবার এই পাখির উড়াল দেওয়া যে দ্যাখে সে সারাজীবন তাকে খোঁজে।”

“চুপ করে আছেন কেন?”
দীনবন্ধু পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে একটু হাসার চেষ্টা করলেন।তাতে সমস্যা আরও বাড়ল।
হেডস্যার ভ্রু কুঁচকে বললেন, “আমি হাসির কথা কিছু বলেছি! আগে বলুন টিকটিকি নিয়ে
যা শুনেছি তা সত্যি?”

ঘটনাটা দিন সাতেক আগের, স্কুল ছুটির পর জানলা দরজা বন্ধ করছিলেন দীনবন্ধু।ক্লাস এইটের ছেলেদের ঘরে চারটে জানলা।রাস্তার দিকের দুই নম্বর জানালা টেনে বন্ধ করতে গিয়েই বুঝলেন মস্ত একটা ক্ষতি হয়ে গেল । তাড়াতাড়ি জানলার পাল্লাটা সরালেন, দেখলেন একটা টিকটিকির লেজ কেটেছে,সেটা লাফাচ্ছে। একটু ফাঁকে সদ্য লেজকাটা টিকটিকিটা মাথা উঁচু করে তাকে দেখছে।
সংগে সংগে তার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
এই টিকটিকিটাকে তিনি ভাল করেই চেনেন।এই জানলাটার পাশেই থাকে। যেন জানলাটা ওর দেশের বাড়ি । প্রতিদিন জানলা খোলা ও বন্ধের সময় ওর সংগে দেখা হয়। যেন দেখা করতে আসে।প্রথম প্রথম জানালার কাছে একটু সরে গিয়ে স্থির চোখে দীনবন্ধুর দিকে তাকিয়ে থাকত।মাস খানেক হল সে আগের মত তাকে দেখেই সড়সড় করে দেয়াল বেয়ে খানিকটা দূরে চলে যাচ্ছে না। তিনি এতে অবাক হলেন।আশ্চর্য, এমন হয় নাকি! টিকটিকি মানুষ দেখে সড়সড় করে পালিয়ে যাবে এটাই তো স্বাভাবিক। উল্টে পালিয়ে না গিয়ে তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে কেন?
বাড়ি ফিরেও কোনো কোনো দিন মনে পড়ত টিকটিকিটার কথা। বেচারি তার মতই একা। অন্য কোথাও চলে যায় না কেন? সেও কী দীনবন্ধুর মত অপেক্ষা করছে কারুর?
দীনবন্ধু টিকটিকিটার নাম রাখলেন ,’উদাস’।সেই উদাসের লেজ কাটা পড়ল তার ভুলে! মনেহল লোহারমত শক্ত হাতে মনখারাপ তার গলা আঁকড়ে ধরেছে ।যার কালচে মুখের ছায়া তাকে স্পষ্ট কিছু দেখতে দিচ্ছে না।বাইরের রোদ্দুর নরম হয়ে আসা আষাঢ়ের বিকেলটা দুমকরে কালো হয়ে গেল। কোথাও রোদ নেই, ধুলো ওড়া নেই,রাস্তার ওপারে টলটলে পুকুরটা আর ঝুকে জল ছুঁতে চাওয়া ডুমুর গাছটা নেই।নাম না জানা পাখির কিচিরমিচির নেই। কিচ্ছু নেই।
বিস্ময়ে কিংবা যন্ত্রণায় হাঁ হয়ে থাকা একটা টিকটিকির সামনে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। যার লেজটা বেশ কয়েক সেকেন্ড তিড়িংবিড়িং লাফিয়ে সবে শুয়ে পড়েছে।

কিছুতেই লেজকাটা উদাস কে ছেড়ে কোথাও যেতে পারলেন না দীনবন্ধু মন্ডল।কোথাও যাবার মত ইচ্ছেটা যেন হাত ফসকে পড়ে গেছে গভীর এক কুয়োর তলায়। মন্ত্র মুগ্ধের মত তাকিয়ে থাকলেন অনেকক্ষণ।মস্ত স্কুল বাড়িতে তিনি একা।ঠিক এ সময় আজকের মত দূরে নাম না জানা একটা পাখি ডাকতে লাগল।

“চুপ করে না থেকে বলুন যা শুনেছি তা সত্যি না মিথ্যে? ” উত্তরের অপেক্ষায় দীনবন্ধুর মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন সাধনবাবু।
” আসলে স্যার আমার ভুলেই ওর লেজ কাটা পড়েছিল।সেই থেকে মায়া পড়ে গেছে,ছাড়তে পারিনি।”
“ওটাকে পকেটে নিয়ে ঘোরেন?”
“ঘুরিনা স্যার,আমি স্কুলে এসে ওকে ওই জানলার পাশে ছেড়ে দিই আর যাবার সময় নিয়ে যাই।”
“শুনুন, দু’জন স্যার আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে।বিষয়টা সিরিয়াস।আপনি এমন কান্ড কেন করলেন বুঝতে পারছি না।ওনারা আরও যা বলেছেন তা ম্যানেজিং কমিটির কানে গেলে কত বড় সমস্যা হবে জানেন?”
“জানি স্যার।”
“না, কিছুই জানেন না।যান, আজই ওটাকে বিদেয় করুণ।আর যেন এসব কথা না শুনি।যান।”

দীনবন্ধু ঘর থেকে বেরুতে যেতে গিয়েও ফিরে এল,”টিকটিকিটা বিদেয় করলে আমার সমস্যা বাড়বে, স্যার।”
“মানে?”
যেদিন উদাসের লেজকাটা পড়ল সেদিন থেকে আমার কিছু একটা হয়েছে স্যার।প্রথম প্রথম কিছুই বুঝতে পারতাম না।এখনও যে সবটা বুঝেছি তা নয়। খানিকটা বুঝেছি।হয়ত আপনার বিশ্বাস হবে না তবু বলি, আমি স্যার অনেক কথার ভিড়ে সত্যি কথা চিনতে পারি।জানি সহজে আমার কথা কেউ বিশ্বাস করবে
না।না করারই কথা। আমি এতে কিছু মনে করি না।আপনি চাইলে পরীক্ষা করতে পারেন।পরীক্ষা নেবেন স্যার?”

হেডস্যার হাসলেন, “কালরাতে ঘুম হয়েছে? ঘুমে সমস্যা হলে এমন মনে হয়। আমার সামনে আর কখনও এমন আবোলতাবোল কথা বলবেন না। যান। অনেক কাজ আছে আপনার সংগে বকবক করলে চলবে না।আর শুনুন ওই জীবটাকে এক্ষুনি কোথাও ফেলে দিয়ে আসুন।আমার বড্ড গা ঘিনঘিন করে।”

দীনবন্ধু তবু চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তার মাথার কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে কেউ যেন বলছে, তোমার এই কাজটাও চলে যাবার সময় হয়ে এসেছে দীনবন্ধু! তুমি কিছুতেই সব গোপন রাখতে পারবে না। মানুষের সবচেয়ে বড় লোভের নাম কৌতুহল।

মাসচারেক হল এই নয়াপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে দীনবন্ধু ঘন্টা বাজানো, দরজা জানলা বন্ধ করার কাজ পেয়েছেন। মাস গেলে তিন হাজার টাকা পান।
মাস পাঁচেক আগে দপ্তরি কমল সাহা স্কুলেই মাথা ঘুরে পড়ে যান।স্ট্রোক, এখনও কোমায় আছেন।যতদিন দপ্তরি না ফিরছেন ততদিন চালিয়ে নেবার এই কাজের খোঁজটা এনেছিল একজন।সেই থেকে তিনি কাজে লেগে পড়েছেন। এর আগে মনি জোয়ারদারের সেরেস্তায় ফাইফরমাশ খাটতেন।একদিন মনি জোয়ারদার বলে উঠল,অনেক বয়স হয়েছে আপনার এসব কাজ ছাড়েন,কাল থেকে আমার বাড়ির সামনে থাকবেন।আপনার কাজ হল, “আমি যখন সেরেস্তায় থাকব তখন দেখবেন কে আসে আমার বাড়িতে। বেতন এখন যা পান তাই পাবেন। শুধু মন দিয়ে কাজটা করবেন, পারবেন তো?”
সে কাজ করেছিলেন আটমাস। একদিন ধরা পড়ে গেলেন।মনি জোয়ারদারের বৌ তাকে দেখে ফেলল।শুধু দেখল না, ডাকল। নিজে গটগট করে বাড়ির সদর দরজা খুলে বেরিয়ে এসে বলল, “এই যে শুনছেন?আপনাকেই বলছি?”
তিনি এগিয়ে যেতেই বৌটা বলেছিল, “টিকটিকি হতে ভাললাগে ?এছাড়া আর কাজ নেই পৃথিবীতে!এমন পরগাছার মত নাইবা বাঁচলেন!”

তিনি মাথা নীচু করে সব শুনলেন।একবার দৌড়ে পালিয়ে যাবার কথা ভাবলেন। পরক্ষনেই সিদ্ধান্ত বদলালেন। না, তিনি কোথাও যাবেন না। আবার এমন কিছু করবেন না যাতে তার এই ধরা পড়ে যাওয়ার খবরটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।চুপ করে থাকার মধ্যে এক গোপন আনন্দ আছে।বিশেষ করে উল্টো দিকের মানুষজন বুঝতে পারে না। খানিকটা ভেবলে যায়।বিরক্ত হয়।বুঝতে না পেরে একসময় দূরছাই বলে বিষয়টা থেকে সরে পড়ে।
মনি জোয়ারদারের বৌ থামল না, ভেবলেও গেল না, বিরক্ত হল না, আগের মতই চাপা গলায় বলল,”এবার থেকে আমি যা বলব তাই করবেন।আমায় খবর এনে দেবেন, মনি কখন কোথায় যায়।এমনি এমনি এসব করবেন না।বিনিময়ে টাকা দেব।আর কাজটা না করলে মনি কে বলব আপনি আজ আমায় সবটা বলে টাকা চেয়েছেন! এবার ভেবে বলুন,আমার কাজটা নেবেন কিনা?
“নেবো। “
সেই থেকে শুরু হল দু তরফের টিকটিকি সাজা। একটু একটু করে তিনি বুঝতে লাগলেন, এ জগতের কোনো ঘটনা ফেলনা নয়। সব খবর, শুধু ঠিক ঠাক জায়গায় সেসব পৌঁছে দিতে পারলেই অতি তুচ্ছ ঘটনাও বেঁচে থাকবার রাস্তা হতে পারে।
মাস ছয়েক খবর দিয়েছিলেন নিয়মিত।তারপর একদিন সমস্ত হিসেব মিটিয়ে মনি জোয়ারদার বলল, “সামনের মাস থেকে আর আসবার দরকার নেই।”

“একি! এখনও দাঁড়িয়ে আছেন কেন?আর কিছু বলবেন?” বিরক্ত গলায় সাধনবাবু জানতে চাইলেন।
“আপনি বিশ্বাস করলেন না তাই না স্যার!”
“হ্যাঁ, বিশ্বাস করিনি। আপনি এখন যান।”

দীনবন্ধু মাথা নীচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই সাধনবাবুর মোবাইলে একটা কল এল।
চাপা গলায় সাধন বাবু বললেন, ” আর কিছু খবর পেলে জগদীশ?”
জগদীশ বলল, “দীনবন্ধু মন্ডল লোকটা সুবিধের নয় স্যার।খবর পেয়েছি লোকটা দু হাজার তিন সালে একটা খুন করে। জেলে ছিল বেশ কয়েক বছর। আর দুটো দিন সময় দিন ওর ঠিকুজিকোষ্ঠী বের করে ফেলব। এখন রাখছি।পরে কথা হবে স্যার।”


ক্রমশ...



শুভ্রদীপ চৌধুরী

শুভ্রদীপ চৌধুরীর জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৮৩। গ্রামের নাম ইদ্রাকপুর। বাংলাসাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা। প্রথম গল্প প্রকাশ ২০০৪ সালে। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা সূত্রে বালুরঘাটে থাকেন।অক্ষরে আঁকেন গল্প। লেখকের কথায়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যা শেখায়, "যা মনে করায় তার প্রতিচ্ছবিই আমার লেখা"।যোগাযোগঃ subhradip.choudhury@gmail.com

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।