একজন টিকটিকি (পর্ব – ৩)

শুভ্রদীপ চৌধুরী on

ekjon-tik-tiki

লিলি আয়নার দিকে তাকিয়ে শুয়ে আছে। সে আসলে গল্প করছে । গল্পের বিষয় ট্রেন। বিকেলের ট্রেন আসবার সময় পেরিয়ে গেলেই আয়নার  লিলি  তাকে ফিসফিস করে বলে,”আজ ট্রেনটা বড্ড ঢং করছে।সময় যে পেরিয়ে গেছে সে দিকে বাবুর খেয়াল নেই। এভাবে চললে অপেক্ষা জিনিসটার কোনও মানে থাকে না, তাই না?শুধুশুধু কার এত অপেক্ষা করতে ভাললাগে?”
লিলি বলল,”আমার ভাল লাগে। খুব ভাল লাগে অপেক্ষা করতে।”

আয়নার লিলি হাসল।চাপা হাসি। হাসি মাপার যন্ত্র থাকলে দেখা যেত এই হাসি কিছুতেই কাউন্ট করা যাচ্ছে না। মেশিন গম্ভীর গলায় বলত, “স্যরি।”

লিলি কনুইয়ে ভর দিয়ে বালিশ থেকে মাথাটা সামান্য তুলে বলল, “তুমি যাও আমার সামনে থেকে আমি  কিছুক্ষণ একা থাকব।”

আয়নার লিলি বেশ শব্দ করে হাসল,”তুমি একা থাকতে চাও? হা- হা-হা।”

“অসভ্যের মত হাসবে না।তোমাকে আমার অসহ্য লাগছে। আমার সামনে থেকে এক্ষুণি যাও। ” কথাটুকু শেষ করেই লিলি হাঁপাতে লাগল।

আয়নার লিলি চাপা গলায় বলল, “স্যরি।আমি বুঝতে পারিনি তুমি এতটা রেগে যাবে! আর কখনও এমন ভুল করব না।তোমার ছেলে ডাকছে। আমি যাই।”

লিলি আয়না থেকে মুখ সরিয়ে জানালা দিয়ে উঠোনের  দিকে তাকাতেই ছেলেকে দেখতে পেল। জানলার গ্রিল ধরে মাথা উঁচু করে ভয়ভয় চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে সার্থক।  
পাঁচ বছরের ফুটফুটে একটা ছেলে কেন ভয় চোখে মায়ের দিকে তাকাবে ? 
লিলি বলল, “ঘরে আয়।আমার কাছে এসে একটু বস।”
সার্থক ভয় জড়ানো গলায় বলল, “মা তুমি কেন আবার আয়নার সঙ্গে কথা বলছ। এর পর এমন করলে খুব রাগ করব। আর কখনও তোমার সঙ্গে কথা বলব না।বুঝেছ?”

লিলি হাসল,”মনে থাকবে। এবার বল কেন আমায় ডাকছিলি?”

“একটা লোক এসেছে। দাদুর খোঁজ করছে।আমায় দুটো লজেন্স দিয়েছে।তার একটা আমার মুখে আরেকটা হাতে ধরে আছি তুমি খাবে?”

“না, খাব না।”

“দাদুর খোঁজ করতে আসা আসা লোকটা খুব ভাল।  আমায় একটা গল্প শোনাল। পুরো নয় অর্ধেক শুনিয়েছে বাকিটা দাদু আসার পর বলবে।”

“লোকটাকে বসতে দিয়েছিস?”

“হুম,উঠোনে পেঁপে গাছটার কাছে বসতে  দিয়েছি।”

দীনবন্ধু বসে আছেন একটা লাল রঙের হাতল ভাঙা প্লাস্টিক চেয়ারে।  এখন তিনি  মা আর ছেলের কথা শুনছেন। এই কথাবার্তা শুনতে তার চমৎকার লাগছে। ভাবছেন তাদের কথা যেন এমনই চলতে থাকে।
মিনিট পনের আগে এই বাড়িতে এসেছেন।সদর দরজা সামান্য ঠেলতেই খুলে যাওয়াতে তিনি খানিকটা অবাক হয়ে বাড়িটার ভেতরটা দেখছিলেন। খুব সাধারণ দুটো প্লাস্টারহীন ঘর। ঘরের সামনে টিনের ছাউনি দেওয়া বারান্দা। উঠোনের একপাশে দুটো পেঁপে গাছ অন্যদিকে কলপাড়। গলা চড়িয়ে কেউ আছেন কিনা জানতে চাইবার আগেই একটা বাচ্চা ছেলে ছুটে এল,”কে তুমি? কাকে চাই?”

“জগদীশ বাবু বাড়ি আছেন?”

“দুটো লজেন্স থাকলে তবে বলব। পকেটে থাকলে তাড়াতাড়ি দিয়ে দিলে ভাল হয়। না থাকলে  বাজারের দিকে যাবার রাস্তায় তিনটে বাড়ির পর বিশুকাকুর দোকান আছে ওখানে গিয়ে চট করে কিনে আনলে তারপর বলব।”

দীনবন্ধু বাচ্চাটির কথা মত মুখ ঘুরিয়ে হাঁটা দিতেই শুনতে পেলেন,”আমার কথা  বিশুকাকুকে বলতে যেও না। সকালে দু’বার গিয়েছিলাম লজেন্স দেয়নি।”

দীনবন্ধু বলল, “কেন?”

“দাদুর কাছে টাকা পায়।  দাদু দেয়নি, তাই বলেছে আর তোদের বাকি দেব না। তুমি এত কথা শুনে কি করবে যাও আগে আমার লজেন্স এনে দাও।আমার কত কাজ পড়ে আছে, তোমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”

দীনবন্ধু লজেন্স কিনে ফিরতেই দেখলেন পেঁপে গাছের নীচে একটা হাতল ভাঙা এই লাল চেয়ারটা রাখা। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে বাচ্চাটা।
“এনেছ?”
“হুম।”
হাতপেতে লজেন্স দুটো নেবার পর সে বলল, “তোমাকে এখন চুপচাপ এই চেয়ারে বসে থাকতে হবে। ট্রেন এলেই দাদু চলে আসবে।আমি যাই মাকে একটা লজেন্স দিয়ে আসি।”

দীনবন্ধু অনেক খোঁজাখুঁজির পর এই ঠিকানা পেয়েছেন। সুরেশ মন্ডল কিছুতেই বলতে চাইছিল না। লোকটা কে অযথাই ভয় দেখাতে হল।সেটাকে ভয় বলাও ভুল হবে। কিছু মানুষ ভয় পেতে ভালবাসে। ভয়ের জন্য অপেক্ষা করে।দুমকরে টাকা পয়সা সম্পত্তি বাড়তে থাকলে এমন হয়। সেই মুষলধারা বৃষ্টির দিনে সুরেশ মন্ডল মুখ খুলল শুধু মাত্র টিকটিকিটার জন্য। টিক-টিক-টিক। এই মামুলি শব্দে
ভয়ে কুঁকড়ে সুরেশ মন্ডল জানতে চাইল “তোর পকেটে কি বাজে? ঘড়ি?”

“না, না, ঘড়ি নয়।একটা টিকটিকি। আমার সংগেই থাকে। বৃষ্টির জল বুঝি গায়ে লেগেছে তাই বিরক্ত হয়েছে।ওকে আর বেশি বিরক্ত করা ঠিক হবে না। “

“তুই এখন পকেটে টিকটিকি নিয়ে ঘুরিস! “

“ঘুরি কারণ আমি আর সবার মত সত্যি আর মিথ্যে বুঝতে পারতাম না। ও থাকায় এখন সব বুঝতে পারি।”

“কেমন করে বুঝিস?”
“এই যেমন আমি তোমার মাথার উপরে টিকটিকিটাকে রেখে আবার জিজ্ঞেস করব,জগদীশ লোকটা থাকে কোথায়? তুমি যা উত্তর দেবে তাতে টিকটিকি চুপ করে থাকলে বুঝব ভুল আর টিক-টিক-টিক শব্দ পেলে তোমায় বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসব।”

এরপর আর সুরেশ মন্ডল দেরি করেনি জগদীশের ঠিকানাটা বলেই ফেলল।

সেইমত আজ অনেক খুঁজে  এই বাড়িতে আসা।

বাচ্চাটি দৌড়ে এল, “তুমি আমায় চকলেট দিলে 
তবু আমার নাম জিজ্ঞেস করলে না কেন? “

“আমি জানি তোমার নাম সার্থক। ঠিক বলেছি?”

“হুম।এটা ছাড়াও আমার একটা ডাকনাম আছে।সেটা বল দেখি?”

“বিলু।”
“ইয়েস।  বাবা এই নামে  ডাকত।সার্থক নামটা আমার পচা লাগে। বিলু নামটা খুব ভাল লাগে।”

“তোমার বাবা কোথায়  বিলু?”

“মা আর দাদু বলে বাবা গেছে মস্ত কাজে।কাজ ফুরোলে আসবে।তবে আমি সত্যিটা জানি।কাউকে বলি না। চুপিচুপি বলছি  আমার বাবা মরে গেছে।”

“আমায় বললে কেন?””

“তুমি জানতে চাইলে যে! কেউ তো জানতে চায় না। আমি বাবার কথা জিজ্ঞেস করলে কেউ কিছুই বলে না।জিজ্ঞেস করা কি দোষের বলো! জিজ্ঞেস করতেই পারে।এই যেমন তুমি জানতে চাইলে।”

দীনবন্ধুর মন খারাপ হয়ে গেল। আর কোনো কথা না বলে বাড়িটা থেকে বেরিয়ে পড়লেন।পেছন ফিরে বাচ্চাটিকে দেখবার ইচ্ছে হলেও তাকাতে পারলেন না। বহুদিন পর আজ তার চোখ ঝাপসা হয়ে এসেছে। ঝাপসা চোখে একটা শিশুর দিকে তাকানো উচিৎ নয় ! 

বড় রাস্তার মুখে এসে চোখ মুছে একটা বিড়ি ধরিয়ে সামনে তাকাতেই দেখলেন হাত দশেক দূরে একটা পুলিশের জিপ দাঁড়িয়ে আছে। তার ভেতর থেকে এক জন কনস্টেবল হাতের  ইশারায় তাকে ডাকছে। 
দীনবন্ধু ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন।
গাড়ির কাছাকাছি যেতেই সেই কনস্টেবল এবার বেশ গম্ভীর গলায় বলল, “গাড়িতে ওঠ।”
বিড়িটা ফেলে দিয়ে দীনবন্ধু মাথা তুলে একবার আকাশের দিকে তাকালেন।ভাতের হাঁড়ির মত কালচে ঢেপসী মেঘে দল বিকেলের আকাশের রঙ ঢেকে দিচ্ছে।

আবার সেই খসখসে গলা  ভেসে এল, “ওঠ।”

দীনবন্ধু জিপে উঠে বসলেন।

ক্রমশ…


পড়ুন, এই ধারাবাহিক উপন্যাসের আগের পর্ব।



শুভ্রদীপ চৌধুরী

শুভ্রদীপ চৌধুরীর জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৮৩। গ্রামের নাম ইদ্রাকপুর। বাংলাসাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা। প্রথম গল্প প্রকাশ ২০০৪ সালে। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেন। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা সূত্রে বালুরঘাটে থাকেন।অক্ষরে আঁকেন গল্প। লেখকের কথায়, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত যা শেখায়, "যা মনে করায় তার প্রতিচ্ছবিই আমার লেখা"।যোগাযোগঃ subhradip.choudhury@gmail.com

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।