আমরা দেখব না স্বপ্ন? (পঞ্চম পর্ব)

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায় on

amra_dekhbona_swapno_5

“ব্যথা করছে? পেচ্ছাপ করবি?”

ভুরু কুঁচকে একটা লোক তাকিয়ে আছে খুঁড়োর দিকে। খুঁড়োর সত্যিই মাথার পেছনটা চিনচিন করছিল ব্যথায়। কিন্তু ঘাড় কাত করতে ব্যথাটা চড়াং করে উঠল। অস্ফুটে বলে উঠল – ‘মা গো!’। মুখটাও বিকৃত হয়ে উঠল ব্যথায়। 

“পেচ্ছাপ করলে এই প্যানে কর… নামতে যাস না… ডাকবি!”

কপালে হাতে দিতে টের পেলো ব্যান্ডেজ বাঁধা। হাতে স্যালাইন ড্রিপ। মাথার ভেতরটা কেমন ভোঁ ভোঁ করছে। 

খুঁড়ো এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে, ও একটা হাসপাতালের বেডে। সরকারী হাসপাতালে আগেও এসেছে, জেনারেল ওয়ার্ড চিনতে ভুল হয় না। যে লোকটা কথা বলছিল, সে ওয়ার্ড-বয়। লোকটাকে জিজ্ঞেস করল… “ও দাদা, একটু তুলে বসিয়ে দেবে? জল খাবো।”

“না জিজ্ঞেস করে জল দেওয়া যাবে না, স্যালাইন চলছে। পেচ্ছাপ করবি তো বল… প্যান দিচ্ছি।” এসব বলতে বলতেই তুলে বসালো খুঁড়োকে। খুঁড়োর মুখ দিয়ে অবচেতনেই বেরিয়ে গেল “লরিটা সমুদ্রে পড়ে গেছিল?” 

— কী?

— লরিটা? সমুদ্রে পড়ে গেছিল?

— অত জানি না। অ্যাক্সিডেন্ট কেস। সবাই বেড পায়নি। কিছু কেস ফার্স্ট-এড দিয়ে ভাগিয়ে দিয়েছে। 

— লরিটা?

— বললাম তো অত জানি না… খাল-ফালে পড়ে গেছিল বোধহয়। মরেওছে কয়েকজন। বাকিদের নিয়ে এসেছে। 

— আর ওই বুড়োটা?

— কে বুড়ো? এখানে অনেক বুড়ো! তোর হল পেচ্ছাপ করা? 

খুঁড়ো আর কিছু বলল না। চুপচাপ বালিশে ঠেস দিয়ে বসে রইল। দেখতে চেষ্টা করল হাতে-পায়ে আর কোথাও ব্যান্ডেজ পড়েছে কি না। লোকটার কথা শুনে বুঝতে পারল লরিটার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। কোন হাসপাতাল এনে রেখেছে বুঝতে পারল না যদিও। জিজ্ঞেসও করল না। কিছু আসে যায় না। আসতে আসতে মনে পড়ে যাচ্ছিল সেদিনের দুপুরের কথাগুলো। কিন্তু ওই সমুদ্র… সাদা বালি, কালো বালি… বুড়োটা… ঢেউগুলো… মা আর বোন… এগুলো কখন হয়েছে মনে করতে পারল না। মনে হচ্ছিল অনেক বছর আগের কথা… স্মৃতি… স্বপ্ন নয়। ওয়ার্ড-বয় মুখে বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করতে করতে অন্যদিকে চলে যাচ্ছিল। খুঁড়ো একটু কষ্ট করেই গলার স্বর তুলে বলল “ও দাদা… আমার ক’দিন হল এখানে?” লোকটা থমকে দাঁড়ালো, তারপর কাছে এসে বলল “তোর কি আবার জ্বর জ্বর লাগছে?” 

— না… খালি জল তেষ্টা… ক’দিন হল আমার?

— কী করে জানব?! আমার শিফট ছিল… তিন দিন হয়ে গেল দেখছি। তোর কিছুই মনে নেই নাকি? জ্বরে সব ভুলে গেছিস? মাথা ঝেঁকে গেছে? 

তিন দিন কিংবা তারও বেশি আগে অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। তারপর এই ক’দিন কী হয়েছে খুঁড়ো কিছুই জানে না। তেষ্টার কথা আর বলবে না, লোকটা চলে গেলে পাশের বেডে কারো থেকে চেয়ে নেবে – এই ভেবে পাশের বেডের দিকে তাকাতেই চমকে উঠল খুঁড়ো। সেই বুড়োটা! একচোখে ব্যান্ডেজ, মুখে বসন্তের দাগ, বড় থ্যাবড়া নাক, লম্বা সাদা দাড়ি, মাথায় টাক। বগল-ফাটা ফতুয়া আর চেক চেক লুঙ্গি পরে; কপালে একটা হাত রেখে ঘুমোচ্ছে। “বুড়োটা এখানেও আছে?”, একটু জোরেই বলে ফেলল খুঁড়ো। ওয়ার্ড বয় আবার খুঁড়োর কাছে ফিরে এসে বলল “তোর প্রবলেমটা কী বল তো? এত ঝাঁট জ্বালাচ্ছিস কেন? ঘুমো না ভাই?” খুঁড়ো ওই বেডের দিকে দেখিয়ে বলল “এই বুড়োটাও অ্যাক্সিডেন্ট কেস?” 

— আবার কোন বুড়ো? বলছি তো এখানে অনেক বুড়ো!

— ওই যে… ওই বেডে শুয়ে আছে?

— এবারে না চড়-ফড় খেয়ে যাবি অ্যাঁ?! অনেক কাজ থাকে… নক্সা দেখতে আসি না! 

— এ-এ! চেঁচাচ্ছো কেন? মারবে?!

আর একজন ওয়ার্ড-বয় তখন সেখান দিয়ে যাচ্ছিল… দুজনের গলার আওয়াজ পেয়ে এসে বলল “কী হল কী? চেঁচাচ্ছিস কেন? ভিজিটে এলেই তো বাটাম দেবে!” খুঁড়োর কাছে থাকা ওয়ার্ড-বয় সেই অন্য ওয়ার্ড-বয়কে বলল “দেখো না কাজলদা… ফাঁকা বেড দেখিয়ে জিজ্ঞেস করছে ওই বুড়োটা অ্যাক্সিডেন্ট কেস কি না! মাজাকি পোষায়? আর কাজ নেই বলো? ওই বেডের পেশেন্টটা কাল রাতেই মারা গেছে… এসব ভাল লাগে শুনতে?”

সেই ওয়ার্ড-বয় একটু বয়সে বড়, ঠান্ডা মাথার মানুষ। “বাচ্চা ছেলে… মাথায় আটটা স্টিচ পড়েছে। চার দিন বেহুঁশ জ্বর… তার ওপর… একটু বোঝ ভাই?… আচ্ছা তুই যা, আমি দেখছি।” এইসব বলে লোকটাকে পাঠিয়ে দিল। তারপর খুঁড়োকে বলল “জ্বরটা একটু চেক করে নিই? তুই চুপচাপ ঘুমো… অন্য কোন বেডে কে কী করছে, কিচ্ছু ভাবতে হবে না। ওকে?”

খুঁড়ো পাশ ফিরে দেখল সত্যিই বেডটা খালি। ওই কথাগুলো কানে খচখচ করছিল “পেশেন্টটা কাল রাতেই মারা গেছে”। সে নিশ্চয় অন্য কেউ, সেই বুড়োটা না। সেই বুড়ো অত সহজে মরার মাল নয়! 

     হাসপাতালের বেডে শুয়ে ওষুধ, স্যালাইন, বেড-প্যান আর গলা ভাতের মাঝে ঝিমোতে ঝিমোতে খুঁড়ো বাইরের কোনো খবরই পেলো না। জানতেই পারল না যে সেই প্রথম রাতের পর চোদ্দ দিন পার হতেই, প্রথম রাতে যারা ঘুমিয়ে পড়েছিল তাদের একে একে ঘুম ভাঙতে শুরু করেছে। চোদ্দ দিন পার হতেই যে যেখানে ঘুমোচ্ছিল, তাদের চোখের ওপর থেকে বালি সরে যাচ্ছে। মানুষগুলো জেগে উঠছে, কিন্তু কী স্বপ্ন দেখছিল মনে করতে পারছে না। সকলের খুব খিদে পাচ্ছে, অনেকের আবার মুড সুইং হচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে, কেউ বুঝতে পারছে না। জেগে ওঠার পর চোখের পাতায় ঢিবি হয়ে থাকা বালিও যেন বাতাসে উবে যাচ্ছে। সে বালির দানা কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আর! এমন কি গবেষণাগার থেকেও উবে যাচ্ছে চোদ্দ দিন পার হতেই। বিশেষজ্ঞরা চুপচাপ অপেক্ষা করছে এক একটা আক্রান্ত অঞ্চলের চোদ্দ দিন পার হওয়ার। আশার খবর… চোখে বালি নিয়ে ঘুমিয়ে থাকার আর কোনো নতুন ঘটনা নেই। কেউ কেউ চালাকি করছে চোখে বালি দিয়ে, বা অন্য কিছু দিয়ে ধরা পড়লে… বাটাম খাচ্ছে পুলিশের। 

     বাইরের এসব কোনো খবরই খুঁড়ো পেল না। শুধু একদিন গভীর রাতে ঘুম ভাঙতে, উঠে বসে দেখল সেই বুড়োটা ভেসে ভেসে চলে যাচ্ছে ওয়ার্ডের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। আর কেউ তাকে দেখতে পেল না… সবাই ঘুমোচ্ছে। বুড়োটা বেরিয়ে চলে গেল জানলা দিয়ে! জানলা দিয়ে জ্যোৎসনা আসছে। ওয়ার্ডের মেঝেতে সাদা বালি দিয়ে আঁকা পায়ের ছাপ। একটা পায়ের পাতা বড়, একটা পায়ের পাতা ছোট। মেয়েদের ওয়ার্ডে একটা কচি বাচ্চা ককিয়ে ককিয়ে কাঁদছে। ওয়ার্ডের ফিনাইল-ফিনাইল গন্ধটা বদলে কেমন মা-মা গন্ধ হয়ে গেল… হঠাৎই। খুঁড়ো নিজের বেডে উঠে বসে বার বার চোখ কচলে দেখার চেষ্টা করতে লাগল – চোখের পাতায় বালি জমে আছে কি না!



পূর্ববর্তী পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।


ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে মন্তব্য করুন


জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

বর্তমানে হায়দ্রাবাদ নিবাসী  হলেও, জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়ের শৈশব থেকে যৌবন সবটাই কলকাতার শহরতলী জুড়ে। জন্ম ২০শে আগস্ট, ১৯৮৬। বায়োটেকনলজিতে বি টেক শেষ করেই কর্মসূত্রে ২০০৮ সালে কলকাতা ছেড়ে বেঙ্গালুরু চলে যান, এবং তারপর হায়দ্রাবাদ।প্রায় দশ বছর হয়ে গেল, কলকাতার বাইরেই জীবন। বাংলা সাহিত্যের প্রতি নিবিড় ভালবাসা থেকেই একসময় লেখার ইচ্ছে জন্মায়। প্রায় সাত-আট বছর উনি একাধিক আন্তর্জাল পত্রিকা এবং মুদ্রিত পত্রিকায় লিখে চলেছেন গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য এবং কবিতা। ২০১৩ সালে 'আদরের নৌকা' প্রকাশনা থেকে প্রকাশ পায় ওনার প্রথম গল্প সংকলন 'প্রতিবিম্ব'। এর পর ২০১৫ সালে  'হাওয়াকল' প্রকশনা থেকে প্রকাশ পায় ওনার প্রথম উপন্যাস 'কৃষ্ণঘন যাম'। ২০১৭ সালে 'হাওয়াকল' প্রকশনা  থেকেই প্রকাশিত হয় প্রথম অণুগল্প সংকলন 'টিনিটাস'। ২০১৮ সালের কলকাতা বইমেলায় 'তবুও প্রয়াস' প্রকাশনা থেকে জয়দীপের প্রথম গদ্য সংকলন 'হৃদয়পুর কত দূর?' প্রকাশ পায়। এই লেখার মধ্যেই তিনি আনন্দ খুঁজে পান। আর প্রতিযোগিতামূলক এই জীবনে এই লেখাই তাঁর কাছে একটা রিফিউজ। লেখার প্রতি ভালবাসার টানেই উনি লিখতে চান... যতদিন পারেন।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।