বসন্তে ” মহালয়া ” – নাকি ইতিহাসের অকালবোধন

শুভদীপ আইচ on

এখন একটা কথা বেশ আলোচিত হয় নানা আড্ডায় , তর্কে – বিতর্কে । তা হলো বাংলা সিনেমার স্বর্নযুগ কি পুনরায় আসন্ন ? কেউ কেউ বলেন এ যুগ পার হয়ে এসেছে অনেক আগেই , সেই সাদা- কালো ছায়াছবির যুগে । আবার কারো কাছে বিগত ছয় , সাত বছরে এর অধিষ্ঠান । এ তর্ক ফুরোবার নয় । তবু মানতেই হয় যে বাংলা সিনেমা তার নিত্যনতুন বিষয় বৈচিত্রে মাতিয়ে তুলছে দর্শকদের । তবে সেই মাতলামো কতক্ষন ধরে রাখা যাচ্ছে সেটাই হলো সবথেকে বড় প্রশ্ন । বাঙালির জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে যাওয়া একটা নস্টালজিয়া আর তাকে কেন্দ্র করে একটি বিতর্কিত ইতিহাস যা কালিমালিপ্ত করেছিল ‘ সন্ন্যাসী রাজা ‘ কেও – এবারের প্রসঙ্গ : সিনেমা তাকে ঘিরেই ।
যে কোনো আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে টাইমিং একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর । সৌমিক সেন পরিচালিত ও প্রসেনজিৎ চট্টপাধ্যায় প্রযোজিত ‘ মহালয়া ‘ দেখতে গিয়েও তেমনটাই মনে হলো । এমন একটা গ্রাঞ্জার আর স্টারকাস্ট নিয়ে শারদীয়ার উৎসবমুখর দিনগুলোকে কেন যে কাজে লাগানো হলো না তা বোধগম্য হলো না । পরিচালক সৌমিক সেন এর আত্মপ্রকাশ মূলতঃ বলিউডি ছবির হাত ধরে ২০০৬ এ । প্রথমদিকে ৪ টে আনকোরা সিনেমায় স্ক্রিনপ্লে রাইটার হিসেবে কাজ করার পরে পরিচালক, চিত্রনাট্যকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করেন বলিউড ডিভা মাধুরী দীক্ষিতকে সঙ্গে নিয়ে ‘ গুলাব গ্যাং ‘ ছবিতে । এরপর ২০১৯ এ ইমরান হাশমিকে নিয়ে ‘ why cheat India ‘ নামে আরও একটি সিনেমায় পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে তাকে দেখা যায় । ‘ মহালয়া ‘ সেই অর্থে তার ঘরে ফেরা ।

জীবনের প্রথম বাংলা ছবি করতে এসে তিনি এমন একটা স্পর্শকাতর বিষয় বেছে নিলেন , যার জন্য আরো বেশি রিসার্চ এর প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয় । কারণ এর সাথে জড়িয়ে আছে বাঙালির চিরকালীন সেন্টিমেন্ট , অনেক বিখ্যাত মানুষজন । গল্প শুরু হয় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ব্যক্তিগত জীবন যাপনের রোজনামচা দিয়ে । ১৯৩০ সালে বেতারশিল্পী হিসেবে তিনি আকাশবাণীতে যোগ দেন । যার নাম লোকের মুখে মুখে ফেরে , লক্ষ মানুষের হৃদয়ে যার অধিষ্ঠান তার পারিবারিক জীবন , অভাব অনটনের নিত্য সঙ্গদোষ – সেই বজ্রকণ্ঠী লৌহপুরুষকে পেরিয়ে এক রক্তমাংসের ব্যক্তি বীরেন্দ্রকৃষ্ণকে তুলে ধরে । ছবির এই অংশে এসে শুভাশিস মুখার্জীর অভিনয় মনে রাখার মতো ।পুরো চরিত্রের মধ্যে ঢুকে গিয়ে তিনি দৃশ্যগুলোকে জীবন্ত করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন । নাট্যকার হিসেবেও সেই সময় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন । এমনকি 1955 তে মুক্তিপ্রাপ্ত ছায়াছবি ‘ নিষিদ্ধ ফল ‘ এর চিত্রনাট্য ও তারই রচনা । আকাশবাণীর দিল্লির অধিকর্তার চরিত্রে প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জিকে কেন ব্যবহার করা হলো বোঝা গেল না । যাই হোক গল্প অনুযায়ী মূলতঃ তার উৎসাহেই শুরু হলো কৃষ্ণ অপসারণ অর্থাৎ নতুন করে ‘ মহিষাসুরমর্দিনী ‘ গড়ে তোলার পালা । বহু আলাপ আলোচনার পর পঙ্কজ মল্লিককে সরিয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দেওয়া হলো সুরকার এর দায়িত্ব । সঙ্গে আশা , লতা সহ মুম্বই ও বাংলার স্টার শিল্পীদের সঙ্গে নিয়ে জমজমাট বিনোদন । ছবির এই অংশ থেকেই কাহিনীতে আসলো অন্য এক মোচড় । অনুষ্ঠানের জৌলুস বাড়াতে ঠিক করা হলো মহানায়ক উত্তমকুমার কে দিয়ে স্তোত্রপাঠ করানো হবে । যে বাঙালি এতদিন ধরে শুনে এসেছিল দৈববানীর মতো অমোঘ ওই কন্ঠস্বর , সে কি আদৌ মেনে নিতে পারলো তাদের স্বপ্নের নায়কের এই নতুন ভূমিকা ! নাকি ইতিহাসের কালগর্ভে তাকে নিক্ষেপ করলো নিদারুণ হতাশায় । ছবির পরিনতি নির্ধারিত হয়েছে এই বাকি অংশেই ।

পঙ্কজ মল্লিকের ভূমিকায় শুভময় চ্যাটার্জি এই ছবির উজ্বল আবিস্কার । থিয়েটার ও বাংলা টেলিভিশন এর এই ব্যস্ত অভিনেতা যেভাবে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ম্যানারিজম, তেজ ও দীপ্তি দিয়ে ক্রমশঃ জলজ্যান্ত করে তুলেছেন বাঙলা সংগীত জগতের এই কিংবদন্তি চরিত্রটিকে তা এককথায় অনবদ্য । ১৯৭৫-৭৬ এর পটভূমিকায় রচিত এই কাহিনীতে স্বাভাবিক ভাবেই উঠে এসেছে উগ্র হিন্দুত্ববাদের সূচনাকালীন স্ফুলিঙ্গ। যার জেরে অব্রাহ্মণ সন্তান বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কে দিয়ে মহামায়ার স্তোত্রপাঠ না করানোর হুমকি । সেই বাধার সম্মুখে দাঁড়িয়েও তার তেজদীপ্ত অভিনয় বহুকাল মনে থেকে যাবে । বড়দার ভূমিকায় ( হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ) সপ্তর্ষি রায় বেশ সাবলীল । ইন্ডাস্ট্রির উচিত তাকে আরো বেশি করে ব্যবহার করা । পূর্বতন প্রোগ্রাম ডিরেক্টর নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদারের চরিত্রে কাঞ্চন মল্লিকের জন্য ও যে রোলটি ধার্য করা হয়েছিল তা তিনি যথাযথ পালন করেছেন । কিন্তু এই চরিত্রের জন্য অভিনেতা নির্বাচন এ আরেকটু সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল । আরো বেশি দৃঢ়তা ও ব্যক্তিত্ব দাবি করছিল এই চরিত্রটি ।ছোট্ট চরিত্রে অনিন্দ্য বেশ ভালো । ভাস্বর চট্টোপাধ্যায় স্বল্প সময়ের উপস্থিতিকে দারুন ভাবে কাজে লাগিয়ে যথেষ্ট বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয় করে গেছেন । উত্তমকুমারের রোলে তাকে কাস্ট করলেও মন্দ ছিল না । তবে যীশু সেনগুপ্তকেও ভালো লেগেছে । কিন্তু ওই পর্যন্তই , তাঁর অভিনয়ে এমন কিছু চোখে পড়লো না যার জন্য আপনি চুম্বকের টানে সিটের সাথে আটকে থাকবেন । যীশুকে ওই ঋতুপর্ণ আর অঞ্জন দত্ত ছাড়া বাকিরা শুধু নিত্যনতুন সাজে বহুরূপী সাজিয়েই রেখে দিল । নায়কের খুব বেশী সৌন্দর্যবান হওয়ার এটাই বোধহয় জ্বালা ।

একসাথে এতজন নক্ষত্র নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মনে হলো পরিচালক ভালো মশলা পেয়েও রান্নাটা সেভাবে জমিয়ে করতে পারলেন না । এইসব অভিনেতাদের একই ছবিতে কাস্ট করতে গেলে যে মুনশিয়ানা দেখাতে হতো , চিত্রনাট্যে তাদের জন্য যে বাড়তি স্পেস দাবী করছিল তার অনেকটাই মিসিং লেগেছে । এই সিনেমার সবথেকে দুর্বলতার জায়গা মনে হয়েছে ডায়লগ নির্বাচন । সংলাপ লেখক ও রিসার্চার হিসেবে তন্ময় মুখার্জীর আরো একটু বেশী যত্নবান হওয়া উচিত ছিল বলে মনে হলো । প্রতিটি মাহেন্দ্রক্ষনে এসে তিনি ও পরিচালক পাঞ্চলাইন গুলো মিস করে গেছেন । রিসার্চের অভাবও বেশ স্পষ্ট । যে কারণে সিনেমাটি মুক্তির পর থেকেই বিভিন্ন মহলে বিতর্কের ঝড় উঠেছে । বড় একা লাগে’র মতো অসংখ্য গানের সুরকার অসীমা মুখোপাধ্যায় কয়েকদিন আগে সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া একটি বিবৃতিতে জানান , ‘উত্তমকুমারকে এই অনুষ্ঠানে যুক্ত করার প্রস্তাব আমি হেমন্তদাকে দিই। বলি, ‘চলুন, আপনি ও আমি উত্তমকুমারের বাড়ি যাই। উনি থাকলে অন্য মাত্রা পাবে অনুষ্ঠান। ওঁর ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে আমরা গিয়েছিলাম। উনি প্রথমে রাজি হচ্ছিলেন না। পরে রাজি হন। ওঁর ভাষ্যপাঠও খুব কম সময়ের ছিল। তার থেকে বেশি ছিল বসন্ত চৌধুরী, ধ্যানেশনারায়ণ চক্রবর্তী, গোবিন্দগোপাল মুখোপাধ্যায়ের। পার্থ ঘোষও অনুষ্ঠানে ছিলেন। কী করে উত্তমকুমারকে সিনেমায় ও ভাবে দেখানো হল জানি না।’ আরতি মুখোপাধ্যায় মহালয়ার দু’টি অনুষ্ঠানেই গান গেয়েছেন। তাকেও কোনো ভাবেই সিনেমায় গুরুত্ব দেয়া হয়নি । সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে মানুষ দুটো জিনিস খুব ভালো করে মনে রাখে – এক হলো সংলাপ আর দুই সঙ্গীত । দেবজ্যোতি মিশ্র কে বরাবরই একজন আবহসংগীত ধারক ছাড়া অন্য কিছু মনে হয় নি । এককভাবে এখনো পর্যন্ত মনে রাখার মতো সুর তার থেকে পেলাম কই । বরং পুরোনো দিনকে নতুন করে ফিরিয়ে দিয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর কণ্ঠে ” দিনের শেষে ঘুমের দেশে ” গানটি এখনো একাইরকমভাবে আচ্ছন্ন করে রাখে ।

নীলাদ্রী রায়ের সম্পাদনার কাজ মন্দ নয় । সিপিয়াটোনের ব্যবহার ও কিছু জায়গায় কালার সেন্স বেশ ভালো । সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে মৃন্ময় নন্দীও অনেককটাই এগিয়ে নিয়ে গেছেন ছবিকে । ছবিতে কিছু র-ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে । যার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের অন্তিমযাত্রা মনে রেখাপাত করে যায় । তাপস সরকারের আর্ট ডিরেকশন ভালো । কিন্তু মহানায়কীয় সময়কে ধরতে গেলে যে আবহ তৈরী করতে হতো সে কাজে তিনি অনেকটাই অসমর্থ হয়েছেন । যদিও এটা পরিচালকের দায়িত্বের মধ্যেও পড়ে । ওরকম এক গণহিস্টিরিয়া কে ধরতে গিয়ে শুধুমাত্র পাঞ্জাবির হাত নাড়ানো আর ” দাদা , দাদা ” ধ্বনি ছাড়া কিছুই চোখে পড়লো না ।

তবে সিনেমার ভালো – মন্দ দুটো দিকই থাকবে এটাই স্বাভাবিক । বাংলা ছবিতে প্রথম কাজ করতে এসে সৌমিক সেন সন্দেহাতীতভাবে যথেষ্ট ইতিবাচক মানসিকতাই দেখিয়েছেন । এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে যে তিনি সিনেমার বিষয় হিসেবে নির্বাচন করতে পেরেছেন সেটাই অনেক বেশী করে প্রশংসার দাবি রাখে । শুধু একটাই কথা ভবিষ্যতে তিনি যদি আবারও এমনই কোনো পিরিয়ড পিস নিয়ে ফিরে আসতে চান তবে আরো বেশি গবেষণা করে নামবেন এই আশাই রাখি । 

শুভদীপ আইচ

জন্ম : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি , ১৯৮৬ , কলকাতা। নিবাস - দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট শহরে। প্রকাশিত কবিতার বই মেঘ পিওনের চিঠি ( ২০১৭ ), নিঃশ্বাস, প্রেম ও অন্যান্য অনুষঙ্গ ( ২০২০ )।

1 Comment

সোহেল · এপ্রিল 15, 2019 at 9:39 অপরাহ্ন

আরে আরে কেয়া বাত, দারুন ।খুব ভালো সমালোচনা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।