উড়োজাহাজ – আ সিনেম্যাটিক রিয়্যালিটি

ঈশানী বসাক on

পাখির ডানা ভেঙে দিতো পাড়ার খেলতে থাকা ছেলেরা। স্বপ্নকে ভেঙে ফেলে ঠিক এভাবেই রাষ্ট্রের ওয়াফাদাররা। কিন্তু সেই সীমারেখাকে দিব্য ভারসাম্য বজায় রেখে একটা রাজনৈতিক কিন্তু অরাজনৈতিক সিনেমা করে ফেলেছেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। সিনেমার নাম উড়োজাহাজ। আমার ছবিটাকে দেখে একটা চোখ মনে পড়ছে। চোখের এক কোণ থেকে ছবি শুরু। আরেক কোণ দিয়ে সমস্ত শরীর চোখ থেকে বেরিয়ে উড়ে যাচ্ছে। কত দূরে, কত উঁচুতে। আমি উড়তে চাই , আমি উড়তে চাই। একদিন আমি উড়বো।

গল্পের শুরু পার্নোর সেই কথা দিয়ে, জানো আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কত দূর চলে গেছিলাম। ঠিক সেখানেই এক পাখা বিক্রেতা ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছেন পাহাড়ের ধারে। ক্যামেরা পিছু হটছে। জানালার গরাদ আর সেই লোকটির চলে যাওয়া। ক্যামেরা পিছিয়ে এসছে জানলার ভিতর। হ্যাঁ যেখানে সব স্বপ্ন আটকায়, পাখিরা ডানা ঝাপটে ডাকাডাকি করে একদিন চুপ করে যায়। এই অসামান্য ক্যামেরা মুভমেন্ট। সত্যজিত বলতেন ক্যামেরা কথা বলে। পুরো গল্পটা এখানে যেন ক্যামেরা বলছে। যখন ছেলেটি একমনে পরিস্কার করছে বিমানটি তখন পিছনে দুটো গাছ এগোচ্ছে , পিছোচ্ছে। সময়ের এক অসামান্য মেটাফর যা সারা পৃথিবীতে এই প্রথম ব্যবহৃত হলো। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের নিজের কোনো ছবিতে এই টেকনিক আগে আসেনি। সালভেদর ডালির সেই ঘড়ি আর জীবনের ডিমের এক মেটাফর। স্যুররিয়েলিজমের অসামান্য প্রয়োগ।

যুদ্ধের সময় ভেঙে পড়া এক যুদ্ধবিমান জঙ্গলের মধ্যে। ছেলেটা দিনরাত পড়ে থেকে সেই প্লেনটা পরিস্কার করে, রঙ করে। তার প্লেনের গায়ে আঁকা পাখি, গাছপালা, গাড়ি, মাঠ। এই ছবিটার জন্য একটা ভেঙে পড়া যুদ্ধবিমান চাওয়া হয়েছিল। সরকার দেয়নি। আনন্দ আঢ্যর অসামান্য কাজ। একটি ভাঙাচোরা যুদ্ধবিমানের প্রপ। তার সারা গায়ে এই আঁকা। এটাকে ম্যাজিক রিয়্যালিটি, ম্যাজিক রিয়েলিজম বলা যেতে পারে। ছেলেটির সন্তান বলছে, বাবা ও বাবা একটা মেঘ আঁকো, একটা বৃষ্টি আঁকো। বাচ্চাটার বাবাকে যখন পুলিশ ধরতে এসেছে প্লেন ওড়ানোর চেষ্টা করার অভিযোগে সে দরজা আটকে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি সন্তান স্বপ্ন দেখে বাবার মতো, মায়ের মতো। তাই পুলিশ অফিসার বলে ওঠেন, এই যে গাছ, পাহাড়, সমুদ্র, পাখি, গ্রাম, এটা কী তোর না তোর বাবার ? রাষ্ট্র এগিয়ে আসছে। একজন বাবা, একজন সন্তান পিছোচ্ছে। সরল গলায় তাই সেই বাবা বলতে পারেন, আমাদের পাহাড়, আমাদের গাছ, সরকার তো বাবু আমাদের ই। না না সরকার আমাদের নয়। সরকার রাজতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ অপ্রকাশিত। কী নীরবে নিভৃতে লেখক মুখোশ রেখে চলে গেলেন। ছেলেটি থানার সামনে দাঁড়িয়ে । স্যার আপনি বললেই ওরা প্লেনটা এনে দেবে। ক্যামেরা আবার পিছিয়ে আসছে। রাষ্ট্র নজর করছে ক্যামেরাকে। রাষ্ট্র স্বপ্ন বোঝেনা তাই ছেলেটা পাগল। সামনে দিয়ে তার কথাগুলো ট্রামে কাটা পড়ছে। জীবনানন্দকে কেউ বোঝেনি বেঁচে থাকার সময়ে। তারকোভস্কির স্যাক্রিফাইস বলা যাবে কী এই সিনেমাকে?

দ্য ফ্যান্টম অফ অপেরার একটা কনসেপ্ট যেন গোপনে ছুঁয়ে দিলো ছবিকে। সেই থিয়েটারের তলায় ভূতগুলো চাপা পড়ে আছে। ভূত মানে সেই কবরখানা, জীবন, হারানো স্বপ্ন। হ্যাঁ এখানেও সেই উড়োজাহাজের পাশে বসে সেই বাঁচতে না পারা মানুষগুলো। কেউ বা বাঁচতে চেয়েছিল গলায় দড়ি দেবার পর। কেউ নামায়নি ঝুটঝামেলা এড়াবার জন্য। হ্যাঁ বাঁচতে দেওয়া ও আইনশৃঙ্খলার মতি বটে। যে মেয়েটা ভালবাসা পেলো না, যাকেই ভালবাসতে চেয়েছে সেই দূরে সরে গেছে তার মরে যাবার পর ও পরের বার কী সে মনের মানুষ পাবে এই চিন্তা। যে ছাপোষা লোকটা বউ বাচ্চাকে খেতে না দিতে পেরে মেরে ফেলে নিজে মরে গেলো সেও স্বপ্ন দেখে। হ্যাঁ কেন জানি মনে হয় কাফকার ডায়েরি পাতার পর পাতা উল্টোচ্ছে।
এদিকে রাষ্ট্রের দাবি ছেলেটা সরকারের সম্পত্তি দখল করছে। উড়োজাহাজ উড়িয়ে কোনো দলের হয়ে সন্ত্রাস ছড়াতে চাইছে। হ্যাঁ রাষ্ট্র এভাবেই ভাবে। তাই হয়তো আমি মনে করি এই ছবিটা নকশাল আন্দোলনের পঞ্চাশ বছরে একটা অ্যাপোক্যালিপ্স। পুলিশের গুলি খেয়ে ছেলেটা আকাশে উড়ে যাচ্ছে। আমি উড়ছি রে , একদিন তোকে আর তোর মা কে নিয়ে উড়ে যাবো। আকাশে উঠছে প্লেন, তার স্বপ্নে নাকি সেই পাখিটা উড়ছে। চোখের কোণ থেকে ছেলেটা উড়ছে। ফ্যানটম অফ অপেরা। রাষ্ট্র থেকে দূরে, মৃত্যু থেকে দূরে। দ্য প্যালেস অফ ড্রিমস তার গন্তব্য।

ফাঁকা এরোড্রোম, দূরে নীল পাহাড় আর সুবর্ণরেখা।


ঈশানী বসাক

পড়াশোনা গোখেল এবং ডায়াসেশনে। ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বর্তমানে এম এড পাঠরতা। লেখালেখি, সিনেমা দেখা, বই পড়া সবই শখে। বিদেশী ভাষা ও বিদেশী সিনেমায় আগ্রহ আছে।

0 Comments

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।