রবির আলো ও আমার বিভিন্ন ফোকাসের মাত্রাগুচ্ছ

শুভদীপ আইচ on

সহজ পাঠের সহজিয়া দিনগুলো পেরিয়ে পাড়ার জঙ্গল সাফ করবার দিন যখন সমাগত তখন তার ‘ অসন্তোষের কারণ ‘ সর্বপ্রথম আমাকে উদ্বেল করে তুলেছিল । এই যে  শিক্ষাকে আমরা শুধু বহন করেই চললাম , ভুল করেও আর বাহন করলাম না – এই আপ্তবাক্যটি সঙ্গী করে বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাইদের বরাবরই তীব্র উস্কানি দিয়ে এসেছি । পাঠ্য পুস্তক থেকে আবৃত্তির ক্লাস , সংগীতচর্চা থেকে  রংতুলির দুপুর সর্বত্রই তাঁর এমন অনায়াস যাতায়াত  যে লেখা লেখির সূচনালগ্নেই তাঁর প্রভাব রীতিমত কলমের ডগায় টের পেতে লাগলাম । তখন সপ্তম শ্রেণী । বাংলাভাষায় প্রথম অর্ঘ্যটি তাঁকেই নিবেদন করে বসলাম । আর এভাবেই শুরু হলো আমার রবীন্দ্র বন্দনা । তার ওই ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ ‘এর ব্যঞ্জনায় আমিও ‘ছোট প্রাণ , ছোট ব্যথা ‘ আর ‘ ছোট ছোট দুঃখ কথা ‘ কে সঙ্গী করে প্রিয় রবির কিরণে উদ্ভাসিত হতে শুরু করলাম ।

ছোটবেলায় তাঁর মতন আমাদের জীবনেও অভিভাবক ও পাড়া – পড়শিদের টেনে দেওয়া বেশ কিছু লক্ষ্মণগণ্ডি ছিল । ক্রমশঃ তার ওই প্রথম ট্রেনে চড়ার ভয় , বালক রবির চোখে চারদেয়ালের বেড়া টপকে প্রথম দুনিয়াদারির অভিজ্ঞতা সঞ্চয় কখন যেন একাত্ম করে দিলো । তারপর ‘ আমসত্ব দুধে ফেলি , তাহাতে কদলী দলি ‘ র সুস্বাদু যাত্রাপথ পেরিয়ে একদিন ডুব দিলাম জীবন নদীর উপন্যাসসম অনিশ্চয়তায় । মানুষের মন ও মনস্তত্ব নিয়ে তার সূক্ষ্ম কাজ গুলো দিনের পর দিন আরো প্রগাঢ় করলো  আত্মীয়তার বন্ধন ।ভাবসম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তাঁর ক্রমশঃ বানী হয়ে গেঁথে বসে যাওয়া লাইনগুলো —

ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা ,

হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা

তোমার আদেশে ।”

অথবা সেইসব অমর সংগীত –

” বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা-

বিপদে যেন আমি নাহি করি ভয় … ”

– জীবনযুদ্ধে পুরো জ্বালানির কাজ করতে লাগলো ।

তিনি ‘ ঠাকুর ‘ কি না জানা নেই তবে প্রেমিকাদের চোখে তিনি যে ‘ ঈশ্বর ‘, সে মহিমা যৌবনে এসে হাড়ে হাড়ে টের পেলাম । দিনেরবেলার শিবরামীয় কমেডি অতিক্রম করে প্রথম রাতের ইনবক্স তখন শরৎচন্দ্রীয় স্ট্রাটেজি ( নাকি ট্র্যাজেডি ) দিয়ে ভরে উঠেছে । কিন্তু এই সুখ বেশিদিন সইলো না । জীবন শিখিয়ে দিলো – প্রেম যত গাঢ় হতে থাকে  রবীন্দ্রনাথ তত বেশী প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েন ।  বুঝতে পারলাম তাঁর অনুষঙ্গ নিয়ত ধাবমান এবং তা আমাকে প্রতি মুহূর্তে প্রেয়সীর সম্মুখে বিবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে তুলছে । বেসিক্যালি আমি তেমন ভাবে রবীন্দ্রজারিত নই , তার মধ্যে তার কণ্ঠে সান্ধ্যকালীন নিত্যনতুন দুষ্প্রাপ্য রবীন্দ্রসংগীতের আবাহন আমার প্রেমবিলাসের বিসর্জনের ঘন্টা বাজানোর পক্ষে শুরু থেকেই অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করল । তবে চিরাচরিত তরুণ প্রেমের চৌকাঠ পেরিয়ে বৌঠান জাতীয় শিহরিত উঠোনে পা রাখবার ( পিছলাইবার ) ক্ষেত্রেও তাঁর ক্লাসটিচার গোত্রীয় জনপ্রিয়তা ভীষণরকম চোখ টানতো । বারে বারে মনে হতো নারীমনের সূক্ষ জালিকাগুলি তিনি যেভাবে উন্মুক্ত করতে পেরেছেন তারপর আর তেমন করে কেউ পারলো কই । একটা সময় পদে পদে তাঁর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে তাঁকে একপ্রকার ত্যাগ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম , মাটি খুঁড়তে গিয়ে দেখলাম তিনি প্রায় সবক্ষেত্রেই একটা শিলালিপি রচনা করে চলে গেছেন । কি কবিতায় , কি গল্পে , কি উপন্যাসে , কি সেলুলয়েডে তাঁর এই অবাধ বিচরণ আমাকে যারপরনাই বিস্মিত করে তোলে । স্কুলে পড়াকালীন ফি বছর তাঁর জয়জয়ন্তী পালন করবার পর একদিন মনে হয়েছিলো এভাবে একঘেয়ে চিরাচরিত পালনের চেয়ে তাঁর সৃস্টিকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করাই বেশী ভালো । এখনও সেই বিশ্বাসের শরিক হয়েই দিনাতিপাত করছি । এই যে তাকে নিয়ে এত পরীক্ষা নিরীক্ষা , রিমিক্স , রিমেক , ফিউশন আর ফ্যাশনের যুগলবন্দিতে যুবকের পাঞ্জাবীর সুতোয় বা যুবতীর খোঁপায় তথা শাড়ির আঁচল জুড়ে তার অনায়াস যাতায়াত এসব দেখলে তিনি হয়তো বেশ খুশিই হতেন ।  তাই স্বপ্ন দেখি বাল্মীকি প্রতিভার সেই দৃঢ় তরুণ কফি হাউসের দেয়ালচিত্র থেকে বেরিয়ে আবার কোনোদিন রাজপথে এসে দাঁড়াবে । ছেলেটি ‘ ঘরে – বাইরে ‘ পড়েনি বলে বিচ্ছেদপ্রিয় সেইসব অভিমানী প্রেমিকাদের সামনে এসে দাঁড়াবে , মিশে যাবে আবার গ্রাম ছাড়া ওই রাঙামাটির পথে পথে … আর বাঙালীর এই চিরকালীন রবীন্দ্র – আড়মোড়া ভেঙে নতুন পথের দিশা দেখাতে অগ্রণী ভূমিকা নেবে ।


শুভদীপ আইচ

জন্ম : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি , ১৯৮৬ , কলকাতা। নিবাস - দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট শহরে। প্রকাশিত কবিতার বই মেঘ পিওনের চিঠি ( ২০১৭ ), নিঃশ্বাস, প্রেম ও অন্যান্য অনুষঙ্গ ( ২০২০ )।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।