যাবো ব্রজের কুলি কুলি

মানবেন্দ্র সাহা on

আগুনের উল্টোদিকে একটা নির্লিপ্ত নৈশব্দ বয়ে যাচ্ছে অদৃশ্য স্রোতে। একটা প্রাগৈতিহাসিক শৈত্যের ভিতর দিয়ে, একটা আদিম ধুসর কুয়াশার ভিতর দিয়ে দিকভ্রান্ত নদীর মত হারিয়ে যাচ্ছে। মিশে যাচ্ছে কোনো এক ঠিকানা বিহীন দিগন্তরেখায়। আকাশ বাতাস জুড়ে ফাগুন লেগেছে আজ। ফাগুন লেগেছে শহরের কোলাহল থেকে দূরে বহুদূরে মাদলের তালে। ফাগুন লেগেছে দলছুট কোনোএক কিশোরীর মনে। শীর্ণতনু কোপাইএর ছলাৎ মেখে ফাগুয়ার নেশায় মত্ত হয়েছে সে। তার কাছে একটুখানি আগুন ধার নিয়ে দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছে লাজুক পলাশবন। আমি সে আগুনের তাপে হাত সেঁকে চুপচাপ একদিন আরাকান পর্বতের দিকে রওনা দিয়েছিলাম। একটার পর একটা দ্রাঘিমা পার হয়েছিলাম আর পিছনে প্রাচীন বিয়োগান্তক নাটকের নায়িকার মত সমস্ত রঙ গোধূলির আলোয় নিয়ে নিরবে নৈশব্দে সে একদিন মিশে গিয়েছিল কোপাইএর স্রোতে। এরপর যা কিছু পড়ে ছিল তা একটা অন্তহীন নৈশব্দের প্রলাপ। আদিগন্ত বোবা পাথরের আর্তনাদ। সেসব অনেকদিন আগেকার কথা, সেসব অনেকদূরের ছবি। যতদূর মনে পড়ে একজন রাখাইন কিশোরী তার গালে লাল আবীর মেখে আমার আগেআগে হেঁটে এসেছিলো এতদূর।

আমার চশমার ফ্রেমে একটা একগুঁয়ে মশা বারবার মশকরা করে যাচ্ছে। আমার টেবিলে আপনমনে পাতা উল্টাচ্ছে জঁ আর্তুর র‍্যাঁবো। আমি তাকে আড়চোখে মাপি, সেও আমাকে। তারপর একসময় সে আমার হাত ধরে একটা অবিচ্ছেদ্য ইল্যুমিনেশনের মধ্যে টেনে নিয়ে চলে। টেনে নিয়ে চলে টেনে নিয়ে চলে। একটা নদী, একটা খেয়া ডিঙি, দুপাশে নাটুকে বস্তি, কিছু খয়েরী চোখের ফরাসি বালিকা, তাদের পিছনে অজস্র দেবদারু গাছের আড়ালে সুউচ্চ প্রাসাদের মাথায় সূর্যাস্তের লাল। এরপর নদী বাঁক নেয় একটা গ্রামের দিকে। একটা গ্রাম, অবিখ্যাত অরাজনৈতিক একটা গ্রাম। পলাশ শিমুলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একটা গ্রাম।

ক্রমশ অভিকর্ষের বিরুদ্ধে ছুটে চলেছে আমাদের ঋতুবিলাসের গান। শহরের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা বস্তিগুলো আকাশের দিকে হাঁ করে অক্সিজেন খুঁজছে। রাজপথে শুঁয়োপোকার মিছিল থেকে একটি নীল চোখের তুর্কী কিশোরী আমায় এক ঝলকেই চিনে ফেলেছে আজ। আমিও তাকে। এরপর ধীরেধীরে শহরের সব আলো নিভে যায়। আর একটা পাতাহীন বৃক্ষের নিচে নির্ঘুম চাঁদ এসে বসে প্রেমিকার মত। আমার ফ্ল্যাটের জানালা থেকে অনেক অনেক নিচে একটা রুক্ষ ফাগুনমাস। একটা কঙ্কালসার রাত্রির কোলে মাথা রেখে গান শুনছে বিরহিণী চাঁদ। আর বৃক্ষের প্রান্তে লেগে থাকা শেষ কয়েকটি পাতায় একমনে এপিটাফ লিখে চলেছে একলা কোকিল। ঠিক যেমন আমাদের ফেলে আসা শৈশবে একটানা কোকিলের ডাকে ঘুম জড়াতো চোখে, ঠিক যেন ফেলে আসা মাটির চালাঘরের পাশে একটুকরো বসন্ত আজও অপেক্ষা করে থাকে। অপেক্ষা করে থাকে হয়তো একদল দামাল বালক মুঠোয় বসন্তের আগুন নিয়ে। আর আমি দৌড়তে থাকি শুকনো কুলির উপর দুপায়ে ধুলো ওড়াতে ওড়াতে। ঠিক যেন কুলি ভুঁইএর সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছগুলো হাত ধরাধরি করে আজও আগলে রেখেছে আমাদের। আমাদের শৈশব আমাদের বসন্ত আমাদের সীমানা। কুলি ভুঁইয়ে ভূত থাকত।সাদা শাড়ি পরা, লম্বা খোলা চুলে মুখ ঢাকা। দেখিনি কখনো,তবে গ্রীষ্মের দুপুরে পাশের জঙ্গল থেকে ছোট্টছোট্ট ঘূর্ণিঝড়ের বাচ্ছারা ধেয়ে আসত কুন্ডলী পাকিয়ে। ধুলো, লজেন্সের ফেলা দেওয়া কাগজ, পাখির পালক উড়িয়ে ধেয়ে আসত ঘূর্ণিঝড়ের বাচ্ছারা। ওগুলোকেই ভূত বলে দৌড়তাম। ভয়ে নয়,অন্য একটা মজা ছিল সে দৌড়ানোর মধ্যে। ছিল ভূত দেখার বাহাদুরি।
.
‘কুলি ভুঁই’ আসলে বিঘা দুয়েক অনাবাদি জমি। একদিকে বাবলা, শ্যাওড়া,খেজুর, ভ্যারেণ্ডা কল্কে আরো নানা আগাছার জঙ্গল। ঐ জঙ্গলেই থাকত ভূত। কখনো কখনো সাহস করে উঁকি দিয়েছি ভেতরে। ভূতের লেপ কাঁথা, মাটির ভাঙ্গা বাসন দেখতে পেতাম। ভূতেদের দেখতে পেতাম না। ভূতেরা তো দিনে থাকে না। ওরা সন্ধ্যায় আসতো। যখন হ্যারিকেনের আলোর সামনে ঘুমে ঢলে পড়তাম। বাবা মাঝে মাঝে কানের কাছে একগোছা চুল ধরে নাড়িয়ে দিতো। আর খুলে রাখা বই খাতা গুলো ফ্যাক ফ্যাক হাসত। তখন ভূতেরা আসত। ভূতেরা সারা রাত থাকত তারপর সকালে কোথায় যেন চলে যেত। কোথায় যেন!
.
আসলে জমিটা কুলির পাশে,তাই নাম ‘কুলি ভুঁই’। ‘কুলি ভুঁই’ এর জঙ্গলে লেপ কাঁথা গুলো ভূতেদের ছিলো না। কোন মানুষ মারা গেলে তার ব্যাবহার করা সামগ্রী ফেলে আসা হত ঐ জঙ্গলে। এই ব্যাপারটা অনেক বড় হওয়ার পরে বুঝেছিলাম। তবে জানার পর খুব মন খারাপ হয়েছিল। ওগুলো ভূতেদের হলেই ভালো হত। কারন ‘কুলি ভুঁই’, জঙ্গল এদের সংগে ভূত না থাকলে মনের মধ্যে সযত্নে লালিত ছবিটা ভীষণ এলোমেলো হয়ে যায়। তাই ভূত গুলোকে বন্দি করে রাখলাম মনের বোতলে। এখনো অবসরে খেলি ঘূর্ণিঝড়ের বাচ্ছাদের সঙ্গে। যখন কুলি দিয়ে গান গাইতে গাইতে মাধুকরী করে কোনোএক বৃদ্ধ বাউল “যাবো ব্রজের কুলি কুলি”।
‘কুলি ভুঁই’ আর নেই।সেখানে এখন বাড়ি ঘর। আর ধুলোভর্তি কুলি এখন কালো পিচের রাস্তা। কুলিরা বোধহয় মরে গেছে । মানুষ মরলে ভূত হয়, কুলিরা মরলে কি হয় জানা নেই।
প্রসঙ্গত: কুলি কথার অর্থ গ্রামের সরু রাস্তা, কাঁচা রাস্তা, গলিরাস্তা। তবে এখন আর নেই, মরে গেছে অনেকদিন। তাই শব্দকোষেও আছে কিনা জানি না কুলি কথার মানে।কারন কুলি মরে গেছে অনেক দিন। আর মরে গেছে বলেই ‘কুলি’ বলে কোনো বাংলা শব্দ যে ছিল সেটার খবর রাখেন না অনেকেই। সেলিব্রিটি বাউল তাই গীটার হাতে তারস্বরে গেয়ে ওঠে -“যাবো ব্রজের কুলে কুলে “



মানবেন্দ্র সাহা

কবি মানবেন্দ্র সাহার জন্ম ১৯৮১ সালের ১৫ই জুন বীরভূমের আমোদপুর সংলগ্ন সাহাপুর গ্রামে। পেশায় অধ্যাপক, নেশায় কবি। মানবেন্দ্র সাহার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ' রাত্রির কথা ক্লান্তির কথা' এবং ' সান্ধ্যভাষার রহস্যনির্মাণ'।

1 Comment

রাহেবুল · এপ্রিল 24, 2020 at 12:56 অপরাহ্ন

ভীষণ ভালো একটি গদ্য পড়লাম।

মন্তব্য করুন

Avatar placeholder

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।