এ হাত মুঝে দে দে ঠাকুর

সোহেল ইসলাম on

সে বছর বাড়িতেই কাহিল হয়ে পড়ে আছি।রোদ্দুরের কাছাকাছি বেরোতে পারছি না।মাঝে মাঝেই নাক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।নাকে জলপটি দিয়ে শুয়ে শুয়ে দিন গুনছি।যেসব পাখির নাম জানতাম না,ডাক চিনতাম না,সেগুলো চিনে নিয়েছি প্রায়।মায়ের আদরও বেড়েছে অনেকটা।আব্বা বলছে,সব ঠিক হয়ে যাবে।অস্বমেধের ঘোড়া ছুটবে বলে তার লাল তিলক পরানো চলছে।একদিকে ঘর,বারান্দা,পেয়ারা গাছের ছায়া এই আমার লক্ষণরেখা। অন্যদিকে টেবিলে টিনের বাক্স, চটের আসন স্কুল যাবার অপেক্ষায়।স্কুল আসা-যাওয়ার পথে আতা গাছ আর তোতা পাখি খোঁজা হচ্ছে না।বাড়ি ফিরে স্লেটের ‘অ ,আ ‘এর উপর হাত ঘোরানো হচ্ছে না।যতটা মনে করতে পারি ঠিক এইরকমই চলছিল।বদল ঘটল,যেদিন ওনিডা টিভির শিঙ ওয়ালা দানোটা বাড়ি এল,সঙ্গে নিয়ে সিলভারের কঙ্কাল।ওদিকে মা’র বকাবকি চলছে,এই করে পড়াশুনা সব চুলোয় যাবে।দিদিরা কি খুশি।আমি শুধু ভাবছি,এবার এই দানোর সঙ্গে ঘর করতে হবে।


১৯৯৪।শুক্রবার।বিশ্বকাপের মরসুম চলছে।আর্জেন্টিনা-নাইজেরিয়ার ম্যাচ।বাঁশে সেট করা সিলভারের কঙ্কাল আকাশের দিকে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।একটা নীল তার সেখান থেকে ঝুলে ওনিডা দানোর শিঙ ওয়ালা মাথায় লেগেছে।মনে হবে যেন দানোর স্যালাইন চলছে। রাত্রি ৯ টা(ওই সময়ে শুক্র ও শনিবার হিন্দি মুভি দেখা যেত দূরদর্শনে)।খেয়ে নিয়ে সব ওনিডা দানোর সামনে বসেছি।গব্বর সিং আসছে।’ শোলে ‘ ।আমার দেখা প্রথম মুভি।ডাকু-পুলিশের গুলির লড়াই।গান।নাচানাচি।হোলি।হাত দুটো দুদিকে দড়ি দিয়ে বাঁধা।নির্জন পাহাড়।রুক্ষ জীবন আর একটা তিন মিনিটের হাসি।হাঁ গব্বর হাসছে,আমি একা নই,সাম্বাও সাক্ষী।…এ হাত মুঝে দে দে ঠাকুর…


অন্যমনস্কতার বড়ি যেন এক ঢোকে গিলে ফেললাম।মনে মনে আওড়াচ্ছি,’আতা গাছে তোতা পাখি…’।ডায়লগ গুলো,কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে।দৃশ্যের পেছনে ছুটে যাচ্ছে দৃশ্য।আমি তখন ‘শোলে’র পুকুরে মাছেদের মত গুব গুব করে জল খেয়ে যাচ্ছি।আর ভাবছি,ঠাকুরের হাত বাঁধা কেন।ঠাকুর এমন দেখতে ছিল।তোতা পাখিটা কই, সে এসে কেন গব্বরকে ঠুকরে দিয়ে ঠাকুরকে বাঁচিয়ে নিয়ে যাচ্ছে না।মনে মনে ডাকছি,তোতা পাখি,তুমি এসে বাঁচাও,না হলে যে ঠাকুরের হাত কেটে পড়ে যাবে।তোমাকে খেতে দেবে কে ?সেদিন রাতে ঠাকুর কাটা হাতের যন্ত্রনা নিয়ে আর আমি মন খারাপ নিয়ে ঘুমিয়ে গেছিলাম।পরদিন সকালে আব্বার কাছে জেনেছিলাম,যা কিছু তুমি দেখছ, তার সবটা ধ্রুব সত্য নয়।এখানে হাত সত্যি সত্যি কাটাপড়ে না,আর আমার ঠাকুর এই ঠাকুর নয়।

তারপর অনেক গুলো বছর পার হয়ে এসেছি।ভরা জীবনে ভার বেড়েই গেছে।ঘুরপাক খাওয়া এম্বুলেন্সের মাথায় লাল আলোর মত ছেড়েছুড়ে পালাতে গিয়েও বারবার ফিরে আসা।একসময় অভিযোগ ছিল,আজ আর কিছুই নেই।আমি স্বীকার করি,একদিন পালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম,যেখানে বাজারের ব্যাগ নেই,ধার শোধের ভয় নেই,তুলসী তলা নেই,লবণের ফাঁকা কৌটো নেই,আলুর ঝোলের কৌতুক নেই।জমির আল থেকে নেমে আসা ঘাসের মত,চক্কর দিতে দিতে নেমে আসা সুতো ছেঁড়া লাটাই-র মত,সময়ের আর্তনাদ নেমে আসে কলমের মত,মৃতদেহের ভার নেমে আসা কবরস্থানের মত,নিঃস্ব মানুষের স্নায়ুতে নেমে আসা স্যালাইনের মত হারিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।হয়নি।


কে না ভুলতে চায় মনখারাপ যন্ত্রণা নিঃসঙ্গতা ?কিন্তু পারিনি।যেভাবে ভুলতে পারিনি কাটানো দিনগুলো,যেভাবে ভুলতে পারিনি গব্বরের হাসি,ঠিক সেভাবে ঠাকুরকেও ভুলতে পারিনি।আজও নিজে পড়তে গিয়ে,ছাত্র পড়াতে গিয়ে,নিজের জন্মদিনে,২৫ বৈশাখে…সকালে একটা ফটো ফ্রেমের সামনে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আমরা,তাঁর জন্মদিন।জন্মদিনে কেক কাটা কিংবা বেলুন ফোলানোর রেওয়াজ বাড়িতে ছিল না।অন্তত আমরা ভাই বোনেরা তা কোনোদিন করে উঠিনি।তবুও ওই একটি লোকের জন্মদিনে একত্র হয়ে ফুল দেয়াটা বন্ধ করতে পারেনি কেউ।এতে করে রবীন্দ্রনাথ যতটা না আমার হতে পেরেছিল,তারচে বেশি ছিল আমাদের।এ ভাবনার পেছনে কারণ টা ছিল এরকম―ঘরের কোনের কাঠের আলমারির চারটা তাক ছিল।নিচের তাকে আমাদের ভাইবোনেদের জামাকাপড়।তার উপরের টাতে মায়ের শাড়ি এবং শাড়ির নিচের এখানে ওখানে চাপা রাখা কিছু টাকা-পয়সা।তার উপরে আব্বার স্কুলের কাগজ ও তার জামা প্যান্ট।সবার উপরের টাতে থাকত কোরআন।ফলে যখন তখন,যা তা ভাবে উপরের তাকে হাত দেওয়া যেত না।যেদিন বাড়িতে ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ এসেছিল,সেগুলোর জায়গা হয়েছিল,সবচে উপরের তাকে,কোরআনের পাশে।…সেদিন থেকেই আমি বুঝতে আরম্ভ করেছিলাম,রবি ঠাকুর আমার একার নয়,আমাদের।কোরআনের মতই পবিত্র ও প্রনম্য।তাঁকে দেখা যায়,ছোঁয়া যায় না।ডাকা যায়,গ্রহণ করা যায় না।…ঠাকুর,তুমি আমার অধরাই থেকে গেলে।শুধু মনে পড়ে…এ হাত মুঝে দে দে ঠাকুর…লজ্জা পায়…হেসে ফেলি একা একা।


সোহেল ইসলাম

জন্মঃ ১৯৮৫ সালের ১লা মে । ২০০১ থেকে লেখা শুরু। প্রথম লেখা ব্যাক্তিগত না পাওয়া থেকে।তারপর দেখেছেন শুধু নিজে নয় হাজার হাজার মানুষ না পাওয়ার পুকুরে গলা জলে ডুবে যাচ্ছে,ডুবে আছে, তাদের কাছে নিজেকে দাঁড় করানোর জন্য লেখা। কবির মতে লিখলে ,না বলা গুলো, না বোঝাতে পারা গুলো বলতে পারেন। কবিতা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, "সবাই প্রতিরোধ শিখুক,প্রতিবাদ শিখুক,নিজের দাবি নিজেরাই জানাতে শিখুক।কেউ কারুর কান্না কেঁদে দেয় না।রাজস্থানের গ্রামে রুদালি ভাড়া পাওয়া যায়,কিন্তু আমাদের রুদালি আমরাই হব।কাউকেই এক ছটাক জমি ছাড়বো না।" প্রিয় কবিঃ রঞ্জন আচার্য, রানা রায়চৌধুরী। প্রিয় বই : সম্পর্ক। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ - আব্বাচরিত। উত্তর দক্ষিণ , নাটমন্দির , কবিসম্মেলন , কৃত্তিবাস ও ছোট বড় বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন।

2 Comments

গাফ্ফার আনসারী · মে 9, 2019 at 7:05 অপরাহ্ন

সোহেল দা তোমার লেখাটা পড়লাম। আমাকে মুগ্ধ করো বারবার। ভালো থেকো। তোমার লেখার অপেক্ষায় থাকি।

    সোহেল · মে 11, 2019 at 10:59 পূর্বাহ্ন

    ভালোবাসা নিও গাফ্ফার ???

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।