ডেভিড ফিঞ্চার পরিচালিত কাল্ট ক্ল্যাসিক “জোডিয়াক”

সুরজ ভৌমিক on

zodiac

দেখে ফেললাম ডেভিড ফিঞ্চার পরিচালিত কাল্ট ক্ল্যাসিক “জোডিয়াক”। ফিঞ্চারের বেশ কিছু সিনেমা আমার দেখা ছিল যেমন সেভেন, ফাইট ক্লাব, দ্য কিউরিয়াস কেস অব বেঞ্জামিন বাটন, গন গার্ল, দ্য গার্ল উইথ দ্য ড্রাগন ট্যাটু ইত্যাদি। ফিঞ্চার আমার অন্যতম প্রিয় পরিচালক, তাই নেটফ্লিক্সে এই ছবিটা পাওয়ার সাথে সাথেই দেখে নিলাম।

এবার আসি সিনেমার কথায়। থ্রিলার জঁর বলতে যেই ধারার সিনেমা বোঝায়, জোডিয়াক সেই ধারার প্রতিভূ হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে স্বতন্ত্র করে নেয় গল্প বলার ধরনে। হিচককিয়ান ” হু ডান ইট” ও ক্যাট অ্যান্ড মাউস চেজ এর চিরপরিচিত কাঠামো থেকে বেড়িয়ে আসতে সক্ষম হয় ছবিটি। থ্রিলারধর্মী  সিনেমার উপাদানগুলি যথেষ্ট পরিমানে থাকা সত্ত্বেও, ফিঞ্চারের এই সিনেমাটি ঘুরে বেড়ায় চরিত্রগুলির মনোজগতের অলিগলিতে। সিনেমাটি যেন অন্তহীন এক যাত্রার দিগনির্দেশ করে, অথচ সেই যাত্রার পরিণতি কোনো গুরুত্ব রাখে না পরিচালকের কাছে। জীবন স্রোতঃশীলা নদীর মতো আর ঘটনাপ্রবাহ নিছকই পথদৃশ্য, এমন একটা চিন্তন যেন গোটা সিনেমাজুড়ে প্রতিভাত। “হু ডান ইট” বা ইঁদুর-বেড়াল খেলা যেন তখন নিছক অনুষঙ্গ, মূলে স্থিত একটা উদ্বেগ, একটা উৎকন্ঠা, একটা দোলাচল যা সামাজিক স্থিতবস্থার পরিপন্থী। সামাজিক স্থিতবস্থা গড়ে ওঠে নানা ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে, সামাজিক ক্রিয়া বিক্রিয়ার রসায়নে। কিন্তু হঠাৎ এক বিকৃত মনস্ক ব্যক্তির আবির্ভাবে সেই স্থিতি বিনষ্ট হয়। নিজের চেনাজানা পরিসর হঠাৎ করে অজানা ঠেকে। একটা ভয়, একটা উদ্বেগ যেন আছন্ন করে রাখে। সেই ভয়টা কেবল ব্যক্তি বিশেষে জারিত হয় না, গোটা সমাজ যেন কাঁটা হয়ে থাকে এক অজানা আতঙ্কে। ফিঞ্চার একজন সমাজতাত্ত্বিকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই সামাজিক উৎকন্ঠা কে পর্যবেক্ষণ করেন, বিশ্লেষণ করেন ও তারপর সেলুলয়েডে পরিবেশন করেন। তাই এই সিনেমাটি আর পাঁচটা থ্রিলারের থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। মানুষের মনোজগতে যে দ্বান্দ্বিক অবস্থানের কথা আমরা সমাজতত্ত্বে, দর্শনশাস্ত্রে পাই, তা এই সিনেমাতে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। একদিকে এক অজানা আতঙ্কে কাঁটা হয়ে থাকা সমাজ অন্যদিকে সিরিয়াল কিলারের আবির্ভাবে আলুনী হয়ে যাওয়া একঘেয়ে জীবনে একটু নুনের পরশ। সামাজিক প্রয়োজনে সর্বদা ভদ্রতার মুখোশ পড়ে থাকার বাধ্যবাধকতা থেকে যেন হঠাৎ  রেহাই পাওয়া, তাই তখন সবাইকে জোডিয়াক খুনী হিসেবে ঠাহর করার তাড়না যেন পেয়ে বসে। নিজের অফিসের কলিগ, বাসের সহযাত্রী, রাস্তার পাগল বা ভিখারি মায় নিজের আত্মীয় পরিজন সকলেই যেন কালো মুখোশাবৃত জোডিয়াক খুনী।মানুষের এজাত অবদমিত এবং বিকৃত মনোবাসনা তখন মাস-হিস্টিরিয়ায় পরিণত। সবাই যেন এক একজন শার্লক কিংবা পোয়েরো। পুলিশের কাছে স্রেফ সন্দিগ্ধ ব্যক্তিদের তালিকা পেশ করে ক্ষান্ত হয়না এই মানুষগুলি, তাঁরা চায় সেই সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের মধ্যে থেকে একজন কে ক্রুসবিদ্ধ করতে। তাঁরা খুঁজে ফেরে সেই জুডাসকে যাকে অবিলম্বে তোলা হবে কাঠগড়ায়। ফিঞ্চার এই গণ-হিস্টিরিয়ার দৃশ্যায়ন করেন কমেডির মোড়কে। তাঁতে বক্তব্যের অভিঘাত বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং ব্যাঙ্গের মোড়কে তা আরো ধারালো হয়ে উঠেছে। ফিঞ্চারের এই সিনেমাটি তথাকথিত থ্রিলার স্টিরিওটাইপ থেকে বেড়িয়ে আসতে থাকে প্রায় সিনেমার মধ্যভাগে যখন সিনেমার ন্যারেটিভের অকস্মাৎ পরিবর্তন হয়। এতক্ষনে যা ছিল খুনের পর খুন, সাইফার টেক্সট, ডার্ক ইমেজারি সম্বলিত টপ অব দ্য এজ থ্রিলার তা যেন হঠাৎ করে হয়ে ওঠে ন্যারেটিভ ড্রামা। ফিঞ্চারের ছবি হয়ে যায় পুলিশ প্রসিডিওরের ড্রিল শো। লীড ইনভেস্টিগেটর ডেভ ট্রটস্কি ও তাঁর সহযোগী ক্রমশ হাতড়ে বেড়াতে থাকে অন্ধগলিতে। এক অনতিক্রম্য হতাশা গ্রাস করে এই দুঁদে পুলিশ অফিসারদের। অসংখ্য ক্লু, অসংখ্য টিপ-অফ…..কিন্তু তবু ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় জোডিয়াক সিরিয়াল কিলার। আসলে এই জোডিয়াক খুনী তো কেউ একজন নয়, এই খুনী একটা সামাজিক কল্প মাত্র। জনমানসের ফ্র‍্যাঙ্কেনস্টাইনের সাথে এই অসম লড়াইয়ে গুটিকয়েক পুলিশ বা কয়েকজন সত্যান্বেষী সাংবাদিক কি করে পারবে?  আমরা শিহরিত হয়ে পড়ি যখন দেখতে পাই, সেই জোডিয়াক খুনী গণ-উন্মাদনার ও সর্বগ্রাসী আতঙ্ক ও কৌতূহলের সুযোগ নিয়ে নিজেকে জনগন মনের ভাগ্যবিধাতা রূপে প্রতিষ্ঠা করে নিচ্ছে। জীবন-মৃত্যুর খেলার ডোর এখন তাঁর হাতে অর্পিত। গল্পটা শেষ হয়েও তাই শেষ হয় না। আসলে এই গল্পের শেষ নেই। সাংবাদিকের চরিত্রে রবার্ট ডাউনি জুনিয়ার, জেক জিলেনহাল বেশ ভালো।পুলিশ অফিসারের ভূমিকায় মার্ক রুফালো দুরন্ত। একটু অন্য কথার আসি, থ্রিলার জঁরের শুরুয়াৎ সেই সিনেমার জন্মলগ্ন থেকে। ১৯২০ সালের জার্মান এক্সপ্রেশনিস্ট সিনেমা “দ্য ক্যাবিনেট অব ডঃ ক্যালিগারি” কিংবা ১৯৩১ এর মার্কিন ন্যয়ার ক্ল্যাসিক “M” সেই ধারার সিনেমার প্রথম যুগের প্রতিনিধি। তবে ক্রাইম থ্রিলার দর্শকদের মন জয় করে নিলেও, সিনেমা সমালোচকদের কৃপাদৃষ্টি থেকে ছিল বঞ্চিত। জনমনোরঞ্জক কিন্তু সাহিত্যগুনে খাটো, এই অপবাদে ক্লিষ্ট ছিল থ্রিলারধর্মী সিনেমাগুলি। অতীতে হিচককের সিনেমাগুলি কে দ্বিতীয় শ্রেনীর সিনেমা হিসাবে পর্যায়ভুক্ত হতে দেখেছি, তবে অবস্থার পরিবর্তন ঘটল কাল্ট ক্ল্যাসিক “চায়নাটাউন”এর সেলুলয়েড আত্মপ্রকাশে। ১৯৭৪ সালের রোমান পোলানস্কি পরিচালিত এই নিও-নয়্যার ক্ল্যাসিক যেন থ্রিলারধর্মী সিনেমার পরিভাষা বদলে দিল। থ্রিলার মানেই সস্তা বিনোদনের ছবি, একথা বলার জায়গা দিল না এই ছবি। শুধুমাত্র টানটান উত্তেজক স্ক্রিপ্ট নয়, এই ছবির মাধ্যমে পরিচালক এক অজানা প্রান্তরে পা রাখলেন, যা ছিল অসূর্যম্পশ্যা। তিনি থ্রিলারের উত্তেজক উপাদানের সাথে মেলবন্ধন ঘটালেন লস অ্যাঞ্জেলিসের পঙ্কিল রাজনৈতিক আবহ, বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয়, এক অবর্ননীয় পারিবারিক স্ক্যান্ডাল, লাগামহীন দূর্ণীতি, মিথ্যাচার, ধোঁকা ও সর্বোপরি মানুষের গহীন, অতলস্পর্শী মনের কূলঠিকুজি। ক্রাইম থ্রিলার কে কৌলীন্য প্রদান করলেন পোলানস্কি। পরবর্তীতে ” অল দ্য প্রেসিডেন্টস মেন”, “দ্য কনভারসেশন” কিংবা “সাইলেন্স অব দ্য ল্যাম্বস” এই ধারার সিনেমা কে আরও কিছুটা উচ্চতা প্রদান করল। কুখ্যাত ওয়াটার গেট স্ক্যান্ডাল এর উপর তৈরি “অল দ্য প্রেসিডেন্টস মেন” এর যথেষ্ট প্রভাব ফিঞ্চারের জোডিয়াকে পরিলক্ষিত। সমাজের উপর সংবাদপত্রের প্রভাব, সংবাদপত্রের সামাজিক দায়বদ্ধতা, সাংবাদিকের সত্য উদঘাটনের তাগিদ…..প্রায় সবকিছুই ফিঞ্চারের এই সিনেমায় দর্শিত হয়েছে। তার সাথে সুনিপুণ ভাবে তুলে ধরা হয়েছে পুলিশমহলের আভ্যন্তরীণ চিত্র। পুলিশ মানেই লার্জার দ্যান লাইফ চরিত্র হতে হবে বা ঢাই কিলো কা হাত থাকতে হবে, কিংবা ক্ষুরধার মস্তিষ্কের অধিকারী হবে সে, তেমনি স্টিরিওটাইপের ধারেকাছে ঘেঁসেনি ফিঞ্চার। বরং খুব যত্নের সাথে বুনেছেন সবকটা চরিত্রকে। আইনি ঘোরপ্যাঁচ,  দীর্ঘ অনুসন্ধান পদ্ধতি, অসহায়তা, নিজেদের মধ্যে তালমিলের অভাব……সবকিছুই ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক। হ্যাঁ, সেইজন্যই সিনেমার দৈর্ঘ্য হলিউড স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী  খুব বেশী। চিত্রনাট্য সংলাপঘন, শটগুলি অত্যন্ত লম্বা বিশেষত ছবির দ্বিতীয়ার্ধে। হয়ত, এইসব নানাবিধ কারণে এই ছবি অনেক দর্শক ও সমালোচকের পছন্দ হয়নি। তবে, একটা বিষয় স্বীকার্য, হ্যারিস স্যাভিডেসের অনবদ্য সিনামাটোগ্রাফি যা তিনি থমসন ভাইপার হাই ডেফিনেশন ডিজিটাল ক্যামেরায় বন্দী করেছেন এবং সিনেমার অতুলনীয়  সাউন্ডট্র‍্যাক নিয়ে অভিযোগ করা যাবে না। ডেভিড সায়ারের অরিজিনাল স্কোর সত্যিই অসামান্য বিশেষত প্রতিটি চরিত্রের জন্য একটি বিশেষ বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারে যেমন রুফালোর জন্য ট্রাম্পেট, জিলেনহালের জন্য সোলো পিয়ানো আর জোডিয়াক খুনীর জন্য এলোমেলো গীটার স্ট্রিং। তাই বলছি, আর দেরী নয়, দেখে নিন ডেভিড ফিঞ্চার পরিচালিত নিও-নয়্যার ক্ল্যাসিক “জোডিয়াক”।



সুরজ ভৌমিক

জন্ম: জুলাই, ১৯৭৯। নিবাস: দক্ষিণ দিনাজপুরের সদর শহর বালুরঘাট। পেশায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার অধীনস্থ ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের রাজস্ব আধিকারিক। Jack of all trades, master of none. অল্পকয়েকটা বই পড়া আছে আর সিনেমা দেখা আছে, তাতেই একটু নিজেকে প্রকাশ করার চেষ্টা ।

0 Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।