ক্যানভাস ও কিছু বিবর্ণ বাক্যালাপ – সিদ্ধার্থ দাস এর সাথে

শুভদীপ আইচ on

” Art is never finished , only abandoned ”

– Leonardo da Vinci

” দক্ষিনের জানালা ” -র এবারের সংখ্যায় এবার থেকে যুক্ত হলো নতুন একটি বিভাগ — ‘ আলাপচারিতা ‘ । প্রথম পর্বে আমরা বেছে নিয়েছি এক অন্যরকম প্রতিভাকে । যিনি ইতিমধ্যেই তাঁর তুলির জাদুতে ভরিয়ে তুলেছেন অ্যাবস্ট্রাক ছবির জগৎকে । আধুনিক সময়ে রিয়ালিস্টিক ছবির পাশাপাশি এমন কিছু শিল্পী উঠে এসেছেন যারা বদলে ফেলছেন চিরায়ত ছবির আঙ্গিক । ছবির মধ্যে শুধুমাত্র একটি হুবহু স্থির চিত্র ছাড়াও সেই ছবির ভিতরে লুকিয়ে থাকা বর্ণ , গন্ধ , শব্দ , পুঁজ , রক্ত , হতাশা , আলো , অন্ধকারকে তাঁরা স্পর্শ করাতে চাইছেন মানুষের মননে । আমাদের আজকের পর্বের বিশেষ অতিথি সিদ্ধার্থ দাস ও তার ব্যতিক্রম নয় ।

তুমি নিজেকে কি হিসাবে দেখতে ভালবাস ? বা লোকে তোমাকে কি হিসাবে দেখুক বা চিনুক বলে তুমি চাও ?

— অবশ্যই একজন আর্টিস্ট।

— আর্টিস্ট? পেইনটার নয়?

— প্রথমত আমি একজন আর্টিস্ট , তারপর একজন পেইনটার। আর্টিস্ট না হলে পেইনটার হব কি করে !

— তারমানে সমস্ত রকম আর্ট ফর্মই তোমার পছন্দের?

— একদম ।

— তাহলে ছবিই কেন?

— সত্যি বলতে এর উত্তর আমার ঠিক জানা নেই। আমি শুধু রাস্তা খুঁজছি নিজেকে ভালো রাখার। আজ ছবি আছে কাল হয়ত অন্য কিছু হবে। আর একটা কারন অবশ্য আছে…

— সেটা কি?

— কারন একমাত্র এই মাধ্যমটাতেই শিল্পী সরাসরি রঙ ছুঁয়ে থাকতে পারে।

— তাহলে এই রঙ ছুঁয়ে থাকা ইচ্ছের হাত ধরেই তোমার ছবিতে এত বেশি কালার?

— দুর , না না। আমার ছবিতে কয়েকটাই মাত্র কালার ঘুরে ফিরে আসে। এরচেয়ে অনেক বেশি কালারফুল ছবি পৃথিবীতে আঁকা হয়ে গেছে এবং এখনও হচ্ছে । তবে হ্যাঁ , আমি রং–এর প্রয়োগ নিয়ে একটু আধটু পরীক্ষা নিরীক্ষা করি মাত্র । যদিও সেসবও অনেক হয়ে গেছে পূর্বে । একদম নতুন কিছু করে উঠতে পেরেছি কিনা বা কতটা পেরেছি সেটা সময় বলবে ।

— তাহলে বলতে হয় খোঁজ চলছে , তাইতো ?

— হ্যাঁ সেটাই তো … সেখানেই তো আনন্দ ।

— তোমার ছবিতে একটা আলাদা আঙ্গিক , একটা আলাদা প্রয়োগ পরিষ্কার লক্ষ্য করি।

— সে আমার সৌভাগ্য ।

— তুমি বললে রঙ নিয়ে তোমার পরীক্ষা– নিরীক্ষা , এই খেলায় মাতলে কি করে ? মানে শুরুতে ব্যাপারটা নিশ্চয় এই রকম ছিল না ? আমি জানতে চাইছি এই বিমূর্ত ধারার চিত্র–কলার প্রতি আকর্ষণটা কখন থেকে অনুভব করছ ?

— আসলে এখনও আমি শুরুর পথটাই খুঁজে চলেছি। হ্যাঁ একদম ছোটবেলায় এরকম কিছু ভাবতাম না, ভাবা সম্ভবও ছিল না । পরে ধীরে ধীরে চিন্তার পরিবর্তনের সাথে এই পথে আসা ।

— কিন্তু শুধু রঙ নিয়ে ছবি ? তোমার মনে হয় না এটা মাত্রাতিরিক্ত বিমূর্ততা ?

— বিমূর্ততার আবার মাত্রা হয় নাকি …। এসব অনেক আগে হয়ে গেছে Wassily Kandinsky , Jackson Pollock এদের হাত ধরে । আমি তো সেটাই জানতে চাই যেটা আমার জানা নেই, বিমূর্ততা আমায় সেই জায়গাটা করে দেয় ।

— তুমি বললে কয়েকটা রঙ নিয়েই নাড়াচাড়া, কিন্তু কোন বিশেষ রঙে তোমাকে ধরা যাচ্ছে না। তোমার প্রিয় রঙ কি ? কোন রঙের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয় ?

— সব রঙই আমায় সমান আনন্দ দেয় , সমান কষ্ট দেয় । সেদিক দিয়ে বিচার করলে সব রঙই আমার প্রিয় ।

— রঙ ব্যবহারে তোমার সাইকোলজি কি ? প্রত্যেক রঙের তো আলাদা সাইকোলজি আছে । তোমার ছবির ক্ষেত্রে সেগুলো কতটা প্রয়োগ করো ?

— এতো অনেক জটিল প্রশ্ন । অতশত আমি বুঝি না । আমি খুব বিরক্ত হয়েও ছবি আঁকতে পারি , আবার খুশি হয়েও আঁকতে পারি । এবার যেহেতু আমার ক্যানভাসই আমার কথা বলার যায়গা ,তাই যখন আমি আনন্দে আছি তখন আমি একটা মিষ্টি রঙই ক্যানভাসে চাপাব, যা চোখকে শান্তি দেবে , মনকে ভাল করবে । আর যখন আমি বিরক্ত , তখন কিন্তু সেটা করতে চাওয়া বোকামি হবে , স্বাভাবিক ভাবেই আমি সে সময় চোখে জ্বালা ধরানো একটা রঙই আমি বেছে নেবো । যেটা দেখলে দর্শকের মনে বিরক্তির ভাবটা সঞ্চালিত হবে ।

— তারমানে তোমার ছবিতে এক রঙ থেকে অন্য রঙে যাওয়ার ব্যাপারটা সময় এবং প্রাসঙ্গিকতার নিরিখে স্বতঃস্ফুর্ত ?

— হ্যাঁ । একদমই তাই ।

— তোমার ছবিতে রং–এর গড়িয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা বরাবর লক্ষ্য করি , বা বলা যায় গড়ানো তরল রঙ দিয়ে একেকটা ছবি হয়েছে । এটা কিন্তু নতুন একটা স্টাইল । ফেসবুক , ইউটিউব খুললেই এর বহুল ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় ইদানিং । তাহলে এটা কি অনুকরণ ?

— ( হাসি ) দেখ অনুকরন যদি কেউ ভাবে তাহলে তাতে আমার আপত্তি নেই । আমিও ঐ রকম ভিডিও প্রচুর দেখি , বেশ আকর্ষনিয় এফেক্ট আসে । কিন্তু আমার কাজগুলি যদি তুমি পর্যায়ক্রমে দেখ তাহলে বুঝতে পারবে আমি এসব শুরু করেছি ২০০৯–১০ থেকে । তখন কিন্তু এই সব ভিডিও বাজারে আসেনি । আর তাছাড়া আমার রঙ ছাড়ার ধরন ঐসব ভিডিওতে দেখা রঙ ছাড়ার ধরন থেকে একবারেই আলাদা , সেটা আমার ছবিগুলো একটু ভাল করে লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবে । এই মুহুর্তে যে কাজগুলো করছি সেখানে তো রঙ ছাড়ার ক্ষেত্রে পুরোপুরি অন্য স্টাইলে কাজ করছি ।

— তোমার এই রঙ গড়িয়ে একেকটা ছবি গড়ার ব্যাপারটা কি ভাবে ব্যাখ্যা করবে ? তরলের উপর নিয়ন্ত্রন ব্যাপারটাও নিশ্চই সহজ নয় ?

— না সহজ তো একেবারেই নয় । আর সত্যি কথা নিয়ন্ত্রন রাখার প্রয়োজনটাও আমি বিশেষ অনুভব করি না । অনিয়ন্ত্রিত এবং এক্সিডেন্টাল । আসল কথা সমস্ত আবিষ্কারই তো অনিয়ন্ত্রিত এবং এক্সিডেন্টাল । এখানেই মজা । পরীক্ষাটা চলতে থাকে , তারপর একদিন সব সমীকরণ মিলে যায় ।

আমি মনে করি আমাদের জীবনটাও তরল জাতীয় কিছু একটা । আমরা যতোই মনে করিনা কেন আমাদের জীবনের উপর আমাদের পূর্ন নিয়ন্ত্রন আছে , আসলে সেটা ভুল । এবার অনেকেই এই কথা মানতে চাইবেন না , বলবেন – আমার গলা পর্যন্ত হয়েছে কিন্তু আমি ইচ্ছে করলে আরও খানিকটা গিলতে পারব, এটাই তো নিয়ন্ত্রন । আমি বলব না, আপনার ইচ্ছে হলে আপনি গিলতে পারবেন ঠিকই ,কিন্তু সেটা করে আপনি বমি করবেন না বা অসুস্থ হয়ে পড়বেন না তার গ্যারান্টি আছে ? আরে এটা তো গেল নিজের শরীরের উপর নিজের নিয়ন্ত্রনের কথা ,সেটাই আমাদের নেই । আর জীবন তো অনেক বড় ব্যাপার । আমরা হলাম গিয়ে এই প্রকাণ্ড মহাবিশ্বের পৃথিবী নামক একটা ক্ষুদ্র গ্রহের কীটশ্য–কীট । আমাদের কাজই হল গড়িয়ে যাওয়া ( অনিয়ন্ত্রিত ভাবে ) । সে কারনেই আমার ক্যানভাসে ঐভাবে রঙ ব্যবহার করতে ভাল লাগে । সেখানে আমার নিয়ন্ত্রনের জায়গাটাও ঐ গলা পর্যন্ত হওয়ার পরেও গিলতে চাওয়ার মতোই থাকে । বাকি সম্পুর্নটাই রঙের ইচ্ছে ।

— তোমার এই রঙের পরীক্ষানিরীক্ষার মাঝে দর্শকের জন্য কতটা জায়গা রাখ ?

— আমি তো দর্শকের জন্য পুরো জায়গাটাই খোলা রাখি । আমি মনে করি আমার ছবির দর্শক আমার ছবিতে অনেক বেশি পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগ পায় ,যতটা না আমি নিজে করে উঠতে পারি ।

— তোমার ছবির দর্শক তারমানে তারা কি তবে আলাদা কেউ ?

— হ্যাঁ , আলাদা তো বটেই । দেখ সত্যি কথা বলতে আমার ছবি বিশেষ কেউ পছন্দ করেন না । আমার মনে হয় সেটাই স্বাভাবিক ।

— স্বাভাবিক বলছ কেন ? তাহলে কি তোমার ছবিতে ভাবনা নিদর্শনের ক্ষেত্রে কোথাও খামতি আছে বলে মনে করছ ?

— খামতি তো আছেই । নইলে হাতে গোনা কয়েকজন দর্শক নিয়ে দিন কাটাতে হয় কেন … । তবে এই খামতিটুকু থাকুক , কারন আমার ছবি যারা দেখতে চান বা ভালবাসেন তারা কিন্তু সকলেই আর্টিস্ট । এটা আমার বড় প্রাপ্তি ।

— কিন্তু তোমার ছবি যখন প্রদর্শিত হয় তখন তো শুধু মাত্র আর্টিস্টরাই তোমার ছবি দেখে না , কিছু সাধারন লোকও তারমধ্যে থাকে । তারা কি ভাবে তোমার ছবি গ্রহণ করেন ? তাদের প্রশ্নের সন্মুখীন হতে হয় না ?

— হতে হয় বৈকি , বিস্তর হতে হয় । প্রশ্ন হয় – আপনি ছবিতে কি বোঝাতে চাইছেন ? এই ছবিটার মানে কি ? ঐ ছবিটা কেন এঁকেছেন ? ইত্যাদি … । আমি বলি কি এসব প্রশ্নের কোন গুরুত্ব নেই । কারন ধর একজন পেইনটার খুব একটা সহজ জিনিস , একটা কলা আঁকলেন । সকলে সেটাকে দেখল , ভাল বলল এবং বুঝল , কোন প্রশ্ন হল না। এবার যারা বুঝল তাদের আমি যদি প্রশ্ন করি – ছবিটার মানে কি কেউ বলতে পারবেন , বা ছবিটা কেন আঁকা হল সেটা কেউ বলতে পারবেন ? একটা মোটা গোল কলা ছাড়া উত্তরে আর কিছুই আসবে না । তার মানে যেহেতু সেটা একটা কলার–ছবি তাই এইসব প্রশ্নগুলো বিচার্য নয় , শুধু মাত্র আবস্ট্রাক পেইন্টিং–এর ক্ষেত্রেই এগুলি বিচার্য । এটা কেন ?

— তোমার এখনকার ছবিতে রঙের একটা দিলখোলা ব্যাপার চোখে পড়ে। সাধারন ভাবে মনে হয় সেটা অনেকটা ক্যাজুয়াল অ্যাপ্রোচ । বিষয়টা কি সত্যিই ক্যাজুয়াল , নাকি জটিল কিছু আছে ? নাকি ক্যাজুয়ালি জটিল ?

— প্রশ্নটা ভাল করেছ । দেখ আমি আগেই বলেছি আমার ছবিতে নিয়ন্ত্রনের জায়গাটা খুবই কম । সুতরাং ক্যাজুয়াল ব্যাপারটাই বেশি কাজ করে । তবে এটাও কিন্তু ঠিক অতি ক্যাজুয়াল ব্যাপার গুলোই সবচেয়ে বেশি জটিল ।

— নেশা তোমার ছবিকে কতটা প্রভাবিত করে ? নেশা আক্ষরিক অর্থেই বলা ।

— ভীষণ ভাবে কাজ করে । পুরো ব্যাপারটাই তো নেশা । উচু নিচু কতগুলো নেশাই তো Art–Work .

— কিভাবে বোঝ তোমার Art–Work শেষ হল ? মানে তোমার আঁকা ছবিটি শেষ হল ?

— ছবি শেষ করার ক্ষেত্রেও আমি ছবির দাবিকেই প্রাধান্য দেই । এটা ছবিই আমায় বলে দেয় এবার থামা উচিৎ ।

— তোমার কাজ বা Practice – কে যদি ৫টি শব্দে বলতে হয় কি বলবে ?

— সাবলীল অনিয়ন্ত্রিত রঙের নিরন্তন এক্সপেরিমেন্ট ।

” The painting has a life of its own. I try to let it come through. “

— Jackson Pollock

সিদ্ধার্থর সাথে আলোচনা করতে গিয়ে উঠে এলো শিল্পীর স্বতন্ত্র দর্শন এর কথা । উঠে এলো জ্যাকসন পলক এর নাম । যিনি জ্যাজ মিউজিকের তালে তালে নিজের ছবিকে রূপ দিতেন ।

— আচ্ছা ! অ্যাবস্ট্রাক এর ক্ষেত্রে তুমি বলছ যে একটা নিজস্ব দর্শন কাজ করছে । রিয়ালিস্টিক এর ক্ষেত্রেও কি তোমার তাই মনে হয় ?

— হ্যা অবশ্যই আছে । একটা শিল্প তখনই শিল্প হয় , যখন তার ভাবনার সঙ্গে তোমার মিশেল ঘটে । চিন্তা ভাবনার সঙ্গে ক্রিয়াকর্মের মিক্সচারটা , তখনই ম্যাজিকটা ঘটছে । এবার ম্যাজিক এর সময় কি চিন্তা ভাবনার প্রয়োগ থাকে না ? থাকতেই হবে । তোমার হাতের কায়দা আর সায়েন্টিফিক চিন্তাভাবনার দ্বারা একটা ছবির জন্ম হচ্ছে । আর্ট তো তাই । ম্যাজিকটা ক্রিয়েট না হলে আর্ট টা হবে কোথা থেকে ।

— যেমন ? একটা উদাহরণ দাও ।

— ধরো । যদি কেউ বলে সে রিয়ালিস্টিক আর্টিস্ট , অথচ ছবির পেছনে তাঁর কোনো চিন্তা ভাবনা নেই । সেটাতো সম্ভব নয় । সে রিয়ালিস্টিক জিনিসটাকে তাঁর দেখার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এমন একটা রূপে দেখছে যা সচরাচর আমরা দেখতে পাই না । ধরো একটা করিডোরের ছবি আঁকা হচ্ছে । আমরা কোনদিন ভাবতেই পারিনি যে এটাও আর্টের বিষয় হয়ে উঠতে পারে । বা একটা বিড়াল বসে আছে । পাশে একটা টেবিল । একটা ফুলদানী । একটা জানালার কোন , পাশে একটা টেবিল । ধরো একটা ল্যান্ডিং বা সিঁড়ির রেলিং , পাশে টব রাখা আছে , দেয়ালে একটা ছবি তুলছে । সেখানে ল্যান্ডিং এর জানালা দিয়ে যে আলো পড়েছে , সেই দিয়ে মায়াটা ক্রিয়েট হচ্ছে । ম্যাজিকটা ক্রিয়েট হচ্ছে । সেখানে অবশ্যই চিন্তা ভাবনা থাকবে , দর্শন থাকবে । সুররিয়ালিস্টিক এর যে কাজগুলো । সেখানে তো ম্যাজিক টা আরো বেশি ক্রিয়েট হচ্ছে । ফোটোগ্রাফিতেও তো একটা দর্শন আছে ।

— হ্যা । তার এঙ্গেল , তার চিন্তা ভাবনা । একই ছবিকে এক একজন ফটোগ্রাফার এক এক ভাবে দেখছে ।

— হ্যা । সবই আমাদের দেখার উপর নির্ভর করছে । আবার যে দেখতে পায় না তাঁর ও একটা নিজস্ব দেখা আছে । সব দেখা চোখ দিয়ে নয় । আবার সব দেখা দেখতেও পায় না অনেকে চোখ থেকেও ।

” The modern artist is working with space and time and expressing his feelings rather than illustrating ”

~ Jackson Pollock

— তো শুরু হলো কিভাবে ? অ্যাবস্ট্রাক এর ভাবনাটা কি প্রথম থেকেই ? … মানে যে বয়সে আমরা ছবি আঁকি । সেই বয়সে কোথাও যেতে আঁকা শিখতে ?

— হ্যা যেতাম ।

— সেখানে তো প্রথাগত সেই আপেল , ঘর , বাড়ি এসব শেখায় । সেগুলো কি শিখতে ? নাকি ভালোলাগতো না সেটা করতে ?

— না ভালো লাগতো । আসলে ছোটবেলা থেকে সেভাবে কোনদিনই দক্ষ ছবি আঁকিয়ে নই । একটা হয় ড্রয়িং এর হাত কারো কারো খুব ভালো থাকে । সে হতে পারে ছবি আঁকা নিয়ে পরে আর এগোয়নি কিন্তু প্রথম থেকেই পেন্সিল খুব ভালো চালাতো ।

— এটা থাকে । সহজাত একটা প্রতিভা থেকে যায় অনেকের ।

— অনেকে থাকে যাদের হ্যান্ড রাইটিং খুব ভালো থাকে । একদম তেমনই ।

— তো প্রথম ছবি আঁকার দিনগুলো কেমন ছিল ?

— আমাদের পাড়ায় একজন আসতেন ছবি আঁকা শেখাতে । তখন আমি খুবই ছোট । বাড়ির লোকজন আমাকে কোলে করে নিয়ে গিয়ে দিয়ে আসতো । তো সেই বাড়িতে প্রচুর গাছপালা ছিল । পাখিটাখি ছিল । আঁকতে আঁকতে ওই সব দিকে তাকিয়ে থাকতাম । তো দেখতাম ওই স্যার আমি অন্য দিকে তাকিয়ে থাকলেই এই গিঠে , পেন্সিল দিয়ে ঠকাঠক মার । ওই জন্য আমি ওখানে যাওয়া ও ছেড়ে দিলাম । তারপর মালঞ্চ আর্ট । তাপস স্যার । এই ভাবে ধীরে ধীরে শুরু হলো প্রথাগত ছবি দিয়েই ।

ছবি আঁকার ক্ষেত্রে আমার ধ্যান ধারণা বদলালো কলকাতা যাওয়ার পর । সেখানে মেস জীবন , বন্ধুরা , আর্ট গ্যালারিতে ছবি দেখতে যাওয়া । এসব আমার ছবির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেললো । চিন্তা বদলালো , দেখা বদলালো ।আসলে পৃথিবীতে প্রথমে তো অ্যাবস্ট্রাক চিন্তা ছবির ক্ষেত্রে ছিল না । আমার যেটা মনে হয় এটা বেশি করে চোখে পড়া শুরু করে মূলতঃ ক্যামেরা আসার পরে । তখন রিয়ালিস্টিক ছবি হয়ে উঠলো ফটো রিয়ালিস্টিক ।

— বেশ । তা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ছবিই কেন বেছে নিলে ?

— প্রাচীন যুগ থেকে যদি আমরা দেখি তবে প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ছবি ই ছিল প্রথম মাধ্যম । দেয়ালের গায়ে , গুহার গায়ে … মানুষ যখন কথা বলা শেখেনি , তখন থেকে ছবি আঁকে । একটা সহজাত প্রবৃত্তি বলতে পারো । এটা যদি প্রথম কারণ হয় । দ্বিতীয় কারণ হলো , এর থেকে বেটার কোনো মাধ্যম এখনও পর্যন্ত পাই নি । যদি অন্য কোনো মাধ্যম পাই প্রকাশ করার তাহলে সেটাই করবো । ছবি আঁকার বদলে ।

— ছবি কি আদৌ শেখানো যায় ? বা তুমি কি কাউকে শেখাতে চেষ্টা করেছ কোনো সময় ?

— ছবি আঁকা কোনদিনই কাউকে শেখাতে চাই নি । তবে ভাব তো একটা থাকেই সেই মনন টাই কাজ করতো । তবে এই ভাবেই একটা সময় কিছু ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে চেষ্টা করেছিলাম । যে কোন কাজ করতে গেলেই তো তোমার মধ্যে সেই আবেগ টা থাকতে হবে । আমার ক্ষেত্রে কাজ টা হতো অন্যভাবে । আমি ওদের কে নিয়ে বাইরে বসতাম প্রকৃতির মাঝে । ঘরে বসতাম না । বিভিন্ন বয়সের তারা । কারো বয়স সাত বছর , কেউ পাঁচ বছর । আমি তাদের কে মারতাম ও না , বকতাম ও না । তারা যেভাবে ভালোবাসতো সেভাবেই আনন্দ করে শিখত । আমার বাড়ির পেছনে যে জঙ্গল আছে সেখানে নানা রকম পাখির আওয়াজ , বিভিন্ন পোকা মাকড়ের শব্দ সারাক্ষন ই হতে থাকে । একদিন তারা এসেছে আঁকা শিখতে । আমি ওদের বললাম একটা কাজ কর তো সবাই , চোখ বন্ধ কর । শোন কি কি শব্দ পাচ্ছিস । পাশের বাড়ি তে দুধওয়ালা এসেছে সেই শব্দ । সাইকেলের ক্রিং ক্রিং আওয়াজ । এরকম অনেক কিছু । এবার ওদের মধ্যে একজন বললো দুটো পাখির আওয়াজ । আরেকজন বললো তিনটে পাখির আওয়াজ । এবার তারা আসে শব্দ শুনে নিজেদের আঁকায় প্রাণ ঢালত । কোনদিন হয়তো বলতাম শুধু লাইন টান । হাতের উপর নিয়ন্ত্রণ টা তো জরুরী । এবার তাদের বাবা , মা তো আর এসব মানত না । ফলে বেশিদিন সেসব টিকলো না । আবার একজন ছাত্রী জুটলো । তার বাড়ির লোকজনের বক্তব্য সে নাকি খুব ভালো সিনারি ( ল্যান্ডস্কেপ ) আঁকে । তাকে জিজ্ঞেস করলাম এই যে তুমি গাছ একেছ , এটা কি গাছ ? আম গাছ না জাম গাছ । সে অবাক হয়ে গেল । কিছু বলতে পারল না । আমি তাকে বললাম তুমি নিজে গিয়ে দেখো কোনটা কি গাছ । আসলে ছবি আঁকার স্যারেরা গাছ বলতে শুধুমাত্র ওই নারকেল গাছ বা তাল গাছ আঁকা শেখায় । অনেকেই বাচ্চাদের মনেও সেভাবে প্রশ্ন আসার সুযোগ নেই । অথচ প্রশ্ন তো ওরাই করবে ।

প্রশ্নরা এভাবেই উঠে আসুক । ছবির জগৎ নিয়ে আরো বেশি করে চর্চা হোক । সর্বোপরি একটা মুক্ত পরিবেশ গড়ে উঠুক , যেখানে পরবর্তী প্রজন্ম বুক ভরে শ্বাস নিতে পারবে । স্টিরিওটাইপ মাস্টারদের টিপিক্যাল প্রশিক্ষণ এর বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে শিল্পের স্বাধীনতা জোরালো ভাবে আত্মপ্রকাশ করুক । ” দক্ষিনের জানালা ” র পক্ষ থেকে শিল্পী সিদ্ধার্থ দাস এর জন্য রইল আগামীদিনের অনেক শুভেচ্ছা ।



শুভদীপ আইচ

জন্ম : ১৭ ই ফেব্রুয়ারি , ১৯৮৬ , কলকাতা। নিবাস - দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট শহরে। প্রকাশিত কবিতার বই মেঘ পিওনের চিঠি ( ২০১৭ ), নিঃশ্বাস, প্রেম ও অন্যান্য অনুষঙ্গ ( ২০২০ )।

1 Comment

Sayandeep Debnath · এপ্রিল 22, 2020 at 12:32 অপরাহ্ন

Eto colourful chobi, tobu bakkyalap biborno kno?
Best of luck sidhu. Best wishes

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।